লাইফ বীমা খাতের সংস্কার রোডম্যাপ: টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল: একটি আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, যার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বীমা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লাইফ বীমা খাত কেবল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের এক বিশাল উৎস। তবে অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতার কারণে এই খাতটি জিডিপিতে তার কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বীমা বাজারের সফল মডেলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং স্বচ্ছ করপোরেট গভর্নেন্সই পারে এই খাতের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতকে একটি আধুনিক, ডিজিটাল এবং গ্রাহকবান্ধব শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট 'সংস্কার রোডম্যাপ' বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এই নিবন্ধে উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতের উন্নয়নে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নিয়ে একটি বিস্তারিত নীতিগত ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো (Strong Regulatory Framework)
বাংলাদেশে বীমা খাত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। লাইফ বীমা খাতের সংস্কারের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রয়োজন। এর জন্য নিম্নের সম্ভাবনাগুলো চালু করা দরকার:
- ঝুঁকি ভিত্তিক মূলধন (RBC) পদ্ধতি চালু করা;
- সলভেন্সী মার্জিন কঠোরভাবে প্রয়োগ ও মনিটরিং করা;
- ঝুঁকি পরিচালনায় সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা যাতে নিয়মিত যাতে বজায় থাকে তা জন্য ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্রেস টেস্টের ব্যবস্থা করা দরকার;
ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি এন্ড ডেভলপমেন্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (IRDA) রিস্ক-বেজড রেগুলেশন চালু করে বীমা কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে।
২। করপোরেট গভর্নেন্স সংস্কার (Corporate Governance Reform)
বাংলাদেশের অনেক লাইফ বীমা কোম্পানির প্রধান সমস্যা হলো দুর্বল শাসন। করপোরেট গভর্নেন্স সংস্কারে নিচের পদক্ষেপগুলো চালু করা যেতে পারে:
- বোর্ডে স্বাধীন পরিচালক বাধ্যতামূলক করা;
- কোম্পানি পরিচালনায় উদ্যোক্তাগণের হস্তক্ষেপ কমানো;
- নিরীক্ষা ও ঝুঁকি কমিটি শক্তিশালী করা;
- একচ্যুয়ারি এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
এই পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করা হলে-
- লাইফ বীমার প্রতি গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি পাবে;
- বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়বে।
৩। গ্রাহক সুরক্ষা কাঠামো (Policyholder Protection Framework)
গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা বীমা খাতের উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষনে নিম্নের উদ্যোগগুলো গ্রহন করা বাঞ্ছনীয়:
- গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা;
- স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি তদারকি পদ্ধতি চালু করা;
- ইন্স্যুরেন্স অমবাডসম্যান ব্যবস্থা চালু করা।
যুক্তরাজ্যে “আর্থিক পরিষেবা ক্ষতিপূরণ স্কিম” এর মাধ্যমে গ্রহকদের সুরক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে।
৪। বীমা পেনিট্রেশন বৃদ্ধি (Increase of Penetration)
বাংলাদেশে বীমা পেনিট্রেশন নিতান্তই কম (জিডিপি এর তুলনায় খুবই কম) । পেনিট্রেশন বৃদ্ধি করতে নিম্নের স্কীমগুলো চালু করা যেতে পারে:
- জাতীয় পর্যায়ে বীমা সচেতনতা প্রোগ্রাম চালু করা;
- গ্রামীণ জনগণের জন্য ক্ষুদ্র বীমা চালু করা;
- ডিজিটাল বীমা প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
মালয়েশিয়ার সরকার পরিচালিত “সচেতনতা কর্মসূচির” মাধ্যমে বীমা পেনিট্রেশন দ্রুত বৃদ্ধি করেছে।
৫। ইন্স্যুরটেক ও ডিজিটাল রূপান্তর (Insurtech & Digital Conversion)
ডিজিটাল প্রযুক্তি বীমা খাতের দক্ষতা বাড়াতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি পরিপূর্ণরূপে চালু করার জন্য নিম্নের ব্যবস্থা গ্রহন করা যেতে পারে:
- অনলাইন পলিসি ইস্যুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
- ডিজিটাল দাবি পরিশোধ পদ্ধতি চালু করা;
- এআই (AI) ভিত্তিক আন্ডররাইটিং চালু করা;
- মোবাইল অ্যাপস ভিত্তিক (Apps) গ্রাহক সেবা চালু করা।
সিঙ্গাপুর এ ইন্স্যুরটেক ব্যবহার করে দাবি নিষ্পত্তির সময় অনেক কমানো হয়েছে।
৬। পণ্য উদ্ভাবন (Product Innovation)
বাংলাদেশে অধিকাংশ লাইফ বীমাতে এখনও ট্রেডিশনাল এন্ডোমেন্ট পলিসি বিক্রি হয়ে থাকে। নতুন পণ্যের উদ্ভাবন ছাড়া মান্ধাতা আমলের পলিসি বিক্রি করে লাইফ বীমার প্রসার বৃদ্ধি সম্ভব নয়। নতুন পণ্যের সম্ভাবনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- পেনশন বীমা প্রসার;
- শিক্ষা বীমা প্রসার;
- স্বাস্থ সুরক্ষা বীমার প্রসার;
- ক্ষুদ্র বীমার প্রসার।
পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে “ক্ষুদ্র বীমা” এবং “পেনশন বীমা” দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।
৭। গ্রামীণ বীমা সম্প্রসারণ (Grameen Insurance)
বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ গ্রামে বাস করে। অধিকাংশ জনগণ সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসাবে মাইক্রো ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসাবে বীমাকে বেছে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে মুখ্য করণীয় হতে পারে:
- এনজিও ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বীমা বিতরণ কার্যক্রম চালু করা;
- কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পলিসি চালু করা;
- মোবাইল ভিত্তিক প্রিমিয়াম সংগ্রহ শতভাগ নিশ্চিত করা।
৮। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বীমা তহবিল ব্যবহার (Long term Investment of Fund)
লাইফ বীমা কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় তৈরি করে যা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসাবে নিম্নের খাতগুলো বিনিয়োগের খাত হিসাবে বেছে নেয়া যেতে পারে:
- অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ;
- সরকারী বন্ডে বিনিয়োগ;
- করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ;
- ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ।
উল্লেখ্য সাউথ কোরিয়াতে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগকারী। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও লাইফ বীমা তহবিল বিনিয়োগে অবকাঠামো খাত বেছে নেয়া যেতে পারে।
৯। মানবসম্পদ উন্নয়ন (Human Resource Development)
বাংলাদেশে বীমা খাতে দক্ষ পেশাজীবীর অভাব রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী ছাড়া বীমা খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দক্ষ পেশাজীবী গড়ে তোলার জন্য যে কাজগুলো করা প্রয়োজন:
- একচ্যুয়ারীয়াল শিক্ষার উন্নয়ন করতে হবে;
- প্রফেশনাল সার্টিফিকেশনের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা জরুরী;
- বীমা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট শক্তিশালী করা।
মালয়েশিয়াতে প্রফেশনাল ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট এর মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক আছে। আমাদের দেশেও প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন।
১০। কর প্রণোদনা (Tax Incentive)
লাইফ বীমা সঞ্চয় বাড়াতে কর সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে নিম্নের বিষয়গুলো করা যেতে পারে:
- প্রিমিয়ামের উপর কর ছাড় বৃদ্ধি করণ;
- পেনশন বীমায় বিশেষ কর সুবিধা দেয়া;
- দীর্ঘমেয়াদী বীমা সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা।
১১। বীমা বাজারের স্বচ্ছতা
বীমা খাতের তথ্য স্বচ্ছ না হলে বাজারে আস্থা কমে যায়। আমাদের দেশের বীমা বাজারে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আস্থাহীনতা। বীমার উপর আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বীমা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিম্নের বিষয়গ্রলো বিবেচনা করা যেতে পারে:
- বার্ষিক দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে;
- আর্থিক সচ্ছলতার অবস্থা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে;
- জনসাধারণের কাছে তথ্য প্রকাশের কাঠামো বিস্তৃত করতে হবে।
১২। দুর্বল কোম্পানির পুনর্গঠন (Insolvency Resolution Framework)
বাংলাদেশে কিছু বীমা কোম্পানি আর্থিক সংকটে রয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা সংকটমুক্ত করতে হলে ধাপে ধাপে স্বচ্ছলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য নিম্নরুপ ব্যবস্থা গ্রহন করা যেতে পারে:
- প্রাথমিক হস্তক্ষেপ ব্যবস্থা;
- একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ;
- পৃষ্ঠপোষক দায়বদ্ধতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
এমতাবস্থায় সঠিকভাবে বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতের উন্নয়নের জন্য নিম্নরুপভাবে তিনটি মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে:
১। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন করা।
২। আবশ্বিকভাবে স্বচ্ছ করপোরেট গভর্নেন্স চালু করা।
৩। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতের সংস্কার কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, স্বচ্ছ গভর্নেন্স এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানো গেলে বীমা খাত কেবল সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রধান উৎস হিসেবে আবির্ভূত হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে এই রোডম্যাপকে বাস্তবে রূপ দিতে।



