স্বাস্থ্য বীমায় গ্রাহক রিটেনশনে বিশ্বাস, না সুবিধা?

রাজ কিরণ দাস: স্বাস্থ্য বীমা খাত এক গভীর পরিবর্তনের সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, তথ্যের সহজলভ্যতা এবং গ্রাহকের বাড়তি সচেতনতা বাজারের চরিত্র পাল্টে দিয়েছে। আগে যেখানে পলিসি বিক্রিই ছিল প্রধান লক্ষ্য, এখন সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়াই হয়ে উঠেছে মূল চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- গ্রাহককে দীর্ঘদিন ধরে রাখে কোনটি বেশি: সুবিধা, নাকি বিশ্বাস?
বর্তমান বাজার বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখায়, সুবিধা গ্রাহককে আকৃষ্ট করে, কিন্তু বিশ্বাসই তাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখে।
স্বাস্থ্য বীমা এমন একটি সেবা, যা মানুষের জীবনের অনিশ্চিত মুহূর্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা জরুরি চিকিৎসার সময় মানুষ শুধু আর্থিক সহায়তা চায় না; তারা চায় নির্ভরতার অনুভূতি। দ্রুত ক্লেইম নিষ্পত্তি, ক্যাশলেস সুবিধা, সহজ কাগজপত্র প্রক্রিয়া- এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা প্রমাণ করে এবং প্রাথমিক সন্তুষ্টি তৈরি করে।
তবে বাস্তবতা হলো, এসব সুবিধা এখন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠানই দিতে সক্ষম। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সবার জন্য উন্মুক্ত। ফলে সুবিধা এখন আর একক পার্থক্য তৈরি করে না। প্রকৃত পার্থক্য তৈরি করে বিশ্বাস।
বিশ্বাস গড়ে ওঠে ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সংকটের মুহূর্তে দ্রুত সাড়া দেয়া, পলিসির শর্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা এবং বিক্রির পরেও যোগাযোগ বজায় রাখা- এসব আচরণ আস্থা তৈরি করে। গ্রাহক তখন অনুভব করেন যে তিনি শুধু একটি চুক্তির অংশ নন, বরং একজন মূল্যবান ব্যক্তি।
ডিজিটাল যুগে বিশ্বাস তৈরির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। লিংকডইনের মতো পেশাগত প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট, স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষণ এবং দায়িত্বশীল মতামত একজন এজেন্টকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সরাসরি বিক্রয় প্রচারের চেয়ে এই ধরনের উপস্থিতি বেশি কার্যকর। কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে মানুষ এখন তথ্য যাচাই করে এবং দক্ষ পরামর্শদাতাকে বেছে নেয়।
ফেসবুক গ্রুপ বা অনলাইন কমিউনিটিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে সরাসরি বিক্রির প্রচেষ্টা সাধারণত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু সহানুভূতিশীল দিকনির্দেশনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং নিরপেক্ষ তথ্য প্রদান ধীরে ধীরে বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তোলে।
ডিজিটাল উপস্থিতির পাশাপাশি বাস্তব জীবনের যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ব্যবসায়িক সভা, কমিউনিটি ইভেন্ট বা সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ একজন এজেন্টকে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য করে তোলে। মুখোমুখি আলোচনার আন্তরিকতা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই সম্পর্ক থেকেই রেফারেল তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
ব্র্যান্ড-ইমেজও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সামাজিক দায়িত্ব পালন, দাতব্য কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা বা গণমাধ্যমে পেশাগত মতামত প্রদান একজন এজেন্টকে কেবল বিক্রেতা নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করে। ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগ- যেমন শুভেচ্ছা বার্তা, পলিসি নবায়নের আগে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বা চিকিৎসা-পরবর্তী খোঁজখবর নেয়া- গ্রাহকের মনে স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্বাসের গুরুত্বকে জোরালো করে। নতুন গ্রাহক অর্জনের ব্যয় সাধারণত বিদ্যমান গ্রাহক ধরে রাখার চেয়ে বেশি। যে গ্রাহক আস্থা অনুভব করেন, তিনি শুধু নিজে থাকেন না, অন্যদেরও সুপারিশ করেন। এই প্রক্রিয়া টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
স্বাস্থ্য বীমা খাতে সুবিধা ও বিশ্বাস- দুটিরই প্রয়োজন রয়েছে। আধুনিক সুবিধা ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি কেবল বিশ্বাসের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বীমা একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি আস্থার প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলেই গ্রাহক থাকবে, সম্পর্ক টিকবে এবং ব্যবসা স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যাবে।



