স্বল্প খরচে রাইডার বীমা দিচ্ছে ফুডপান্ডা বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের শহুরে জীবনে অনলাইন খাবার ও গ্রোসারি ডেলিভারি এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন প্রয়োজনের অংশ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ফুডপান্ডা বাংলাদেশ। গত এক দশকে প্রতিষ্ঠানটি দেশের ডিজিটাল গিগ ইকোনমির একটি বড় নিয়োগদাতা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেলিভারি খাত দ্রুত বাড়ছে। তবে রাইডারদের নিরাপত্তা, আয় ও সামাজিক সুরক্ষা এখনো বড় প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে ফুডপান্ডার বীমা উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু কর্পোরেট কার্যক্রম নয়। বরং গিগ ইকোনমির কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

ফুডপান্ডা বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে ২০১৩ সালে। জার্মানভিত্তিক ডেলিভারি হিরো-এর অধীনে এই প্ল্যাটফর্ম পরিচালিত হয়। বর্তমানে এটি এশিয়ার বড় ফুড ও কুইক-কমার্স নেটওয়ার্কগুলোর একটি। বিভিন্ন দেশে পুনর্গঠনের পর এখন প্রায় ১০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। এশিয়ার ৪০০টিরও বেশি শহরে তারা সেবা দিচ্ছে।

বাংলাদেশে শুরুতে ঢাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রম ছিল। এখন এটি দেশের বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার রেস্টুরেন্ট ও মার্চেন্ট এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ফুডপান্ডা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এর বড় অংশই রাইডারভিত্তিক।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ফুডপান্ডার বড় শক্তি। এর সঙ্গে আছে ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা। ‘কুইক কমার্স’ মডেলও তাদের এগিয়ে রেখেছে। ‘পান্ডামার্ট’ চালুর পর প্রতিষ্ঠানটি খাবারের বাইরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও সরবরাহ করছে।

তবে এই সাফল্যের আড়ালে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ডেলিভারি রাইডারদের প্রতিদিন ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনা, খারাপ আবহাওয়া, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও আয় অনিশ্চয়তা রয়েছে। এসব কারণে এই পেশা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে একে অনেকেই ‘অদৃশ্য ঝুঁকির চাকরি’ বলে মনে করেন।

এই পরিস্থিতিতে ফুডপান্ডা বীমা সেবা প্রদানকারী বীমাফাই-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে। তারা একটি সাশ্রয়ী দুর্ঘটনা বীমা চালু করেছে। বছরে মাত্র ৭০ টাকায় এই সুবিধা পাওয়া যায়। এতে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ রয়েছে। এটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

বীমা দাবির প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। রাইডাররা অ্যাপের মাধ্যমে ক্লেইম করতে পারেন। ডিসপ্যাচ টিম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মও ব্যবহার করা যায়। তবে মোটরবাইক বা ব্যক্তিগত সরঞ্জামের ক্ষতি এই বীমায় অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই অনেকের মতে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ফুডপান্ডা আরও একটি উদ্যোগ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএসসি'র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। তারা ১,০০০ জন শীর্ষ রাইডারের জন্য ফ্রি বীমা চালু করে। এই পরিকল্পনার নাম 'পান্ডা রাইডার্স পার্সোনাল অ্যাক্সিডেন্টাল ইন্স্যুরেন্স'। এতে মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতায় সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা দেয়া হয়। আংশিক অক্ষমতায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি পারফরম্যান্সভিত্তিক সুরক্ষার একটি উদাহরণ। এতে ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি দক্ষ রাইডার ধরে রাখা সহজ হয়। কর্মীদের আস্থাও বাড়ে।

তবে ব্যবসায়িক বাস্তবতা কঠিন। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের শেষে ফুডপান্ডা বাংলাদেশের লোকসান ১,০০০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই খাত এখনো প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে। কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে বড় খরচ প্রয়োজন। তবুও রাইডার সুরক্ষায় বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বজুড়ে ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো এখন চাপের মধ্যে আছে। রাইডারদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন আইন হচ্ছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে ফুডপান্ডার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে একটি উদাহরণ হতে পারে।