শান্তা লাইফ অবৈধ ব্যয় করেছে ১৪শ’ শতাংশ, ঘাটতি আছে লাইফ ফান্ডে, আছে ঋণও

আবদুর রহমান আবির: ব্যবসা শুরুর প্রথম ১৩ মাসে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করতে ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১৩৯৬ শতাংশ বেশি ও মোট প্রিমিয়ামের ৩১১ শতাংশ। অবৈধভাবে এই ব্যয়ের কারণে লাইফ ফান্ডে ঘাটতি হয়েছে ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এরপরও ঋণ নিয়েছে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর কোম্পানির সম্পদ রয়েছে ২৩ কোটি ৯ লাখ টাকা।
এছাড়া বেআইনিভাবে কমিশন প্রদানসহ আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাবও দাখিল করেছে গোঁজামিল দিয়ে। এমন আর্থিক অবস্থায় গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে শান্তা লাইফ কতটা সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আর্থিক অবস্থার এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
অবৈধ ব্যয় ১৪শ’ শতাংশ
শান্তা লাইফ অনুমোদন পায় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর। ওই বছরের শেষ এক মাসে কোম্পানিটি ৪৪ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয়ের জন্য ব্যয় করে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করতে ব্যয় করে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে ব্যবসা শুরুর প্রথম ১৩ মাসে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মোট প্রিমিয়াম আয়ের জন্য শান্তা লাইফ ব্যয় করেছে ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১৩৯৬ শতাংশ বেশি এবং মোট প্রিমিয়াম আয়ের ৩১১ শতাংশ।
এই ব্যয়ের মধ্যে শুধু বেতন-ভাতা খাতেই কোম্পানিটি খরচ করেছে প্রিমিয়ামের ১৬১ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে খরচ করেছে ১৪১ শতাংশ।
ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকে অফিস স্থাপন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ব্যয় কিছুটা বেশি হয় -এমন ধারণা রয়েছে দেশের লাইফ বীমা খাতে। অনেকে মনে করেন, প্রথম দিকে ব্যয় বেশি হলেও পরে প্রিমিয়াম আয় বাড়লে ব্যয় কমে আসবে। এমন ধারণার বিষয়ে বীমা বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ করে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি।
তারা বলেন, ব্যবসা শুরুর দিকে বেশি ব্যয় করার সুযোগ নেই। অবকাঠামোগত ব্যয়েরও স্বাভাবিকতা থাকতে হবে। তাদের মতে, ব্যবসা শুরু-ই হয়নি আর অফিস ভাড়া ও অবকাঠামোগত খাতে মোটা অংকের টাকা ব্যয় করা হলো; এই টাকা তো পরবর্তীতে গ্রাহকের প্রিমিয়ামের সাথে সমন্বয় করা হবে। ফলে মূলধন থেকে পরিচালন ব্যয় করলেও তা প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকেরই টাকা।
গড়মিল তথ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রতিবেদন দাখিল
শান্তা লাইফের চতুর্থ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে সংগৃহীত ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। অথচ ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে এই খরচ দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
এই হিসাবে চতুর্থ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তুলনায় ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা প্রায় ১৪ শতাংশ খরচ কম দেখানো হয়েছে।
অপরদিকে কোম্পানিটির নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিল করা তিন ধরণের প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ২০২৫ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে তিন ধরণের তথ্য দেয়া হয়েছে।
আইন লঙ্ঘন করে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে ১৪.৫২ শতাংশ কমিশন প্রদান
আইন অনুযায়ী নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য এজেন্ট কমিশন বাবদ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ খরচের সুযোগ রয়েছে। অথচ শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২৫ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে ১৪.৫২ শতাংশ এজেন্ট কমিশন প্রদান করেছে।
কোম্পানিটির ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২ লাখ ১০ হাজার টাকা নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে কোম্পানিটি এজেন্ট কমিশন বাবদ খরচ করেছে ৩০ হাজার টাকা।
যা আইডিআরএ’র জারি করা “সার্কুলার নং- ৩(খ)/২০১২” এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০১২ সালের ১৫ মার্চ এই সার্কুলার জারি করা হয়।
লাইফ ফান্ডে ঘাটতি ১৪ কোটি টাকা, ঋণ ১৮ কোটি
লাইফ বীমা কোম্পানির প্রাণ হলো তার ‘লাইফ ফান্ড’। লাইফ ফান্ড গঠন করা হয় গ্রাহকের দাবি পরিশোধের জন্য। ব্যবসা শুরুর প্রথম ১৩ মাসে অফিস অবকাঠামো ও কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন-ভাতা বাবদ মোটা অংকের টাকা খরচ করায় গ্রাহকের জন্য লাইফ ফান্ড গঠন করতে পারেনি শান্তা লাইফ।
২০২৪ সালে শান্তা লাইফ ৪৪ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করে। লাইফ ফান্ডে ঘাটতি হয় ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে সেই ঘাটতি তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাইনাস ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়।
ব্যবসা শুরুর প্রথম ১৩ মাসে ১৪শ’ শতাংশ অবৈধ ব্যয় করে বীমা কোম্পানিটি। এ সময়ে কোনো লাইফ ফান্ডও গঠন করতে পারেনি। এর বাইরেও কোম্পানির অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
ফলে লাইফ ফান্ডের এই বিশাল ঘাটতি এবং অন্যান্য খাত থেকে মোটা অংকের ঋণ নেয়ায় গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে কোম্পানিটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জনবল কাঠামো ও বর্তমান অবস্থা
শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স দেশের বীমা বাজারে ব্যবসার লাইসেন্স অর্জন করে ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর। তবে কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী, শান্তা লাইফের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে দুটি শাখা অফিস রয়েছে। এসব অফিসে কর্মরত আছেন ৬১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
কোম্পানিটির মাঠকর্মীর সংখ্যা মোট ৩২৪ জন। এর মধ্যে এফএ ২৫৯ এবং বিএম ৬৫ জন। এ ছাড়াও সুপারভাইজরি লেভেলে (বিএম থেকে উর্ধ্বে) কর্মরত আছেন আরো ৩৮ জন।
যা বলছে শান্তা লাইফ
এসব বিষয়ে শান্তা লাইফের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) ও কোম্পানি সেক্রেটারি মাজেদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, যেকোনো লাইফ বীমা কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার পরিধি তুলনামূলক সীমিত থাকায় পরিচালন ব্যয় কিছুটা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো- এই অর্থ কোম্পানির টেকসই কাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, নাকি কোনো ধরনের আর্থিক অব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শান্তা লাইফের বর্তমান ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগ্য এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের কারণেই মূলত তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হচ্ছে। তবে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে কোম্পানির সার্বিক ব্যয় অনুমোদিত সীমার মধ্যে চলে আসবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে শান্তা লাইফের 'লাইফ ফান্ড' একটি সুদৃঢ় ও ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছাবে।
ব্যবসা শুরুর ৩ বছরের মধ্যে মুনাফা অর্জন করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে মাজেদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, কোম্পানির বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে আগামী ৩ বছরের মধ্যে মুনাফায় ফেরার সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য সময় চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করতে হতে পারে। তবে আইন লঙ্ঘন করে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে ১৪.৫২ শতাংশ কমিশন প্রদানের বিষয়ে কোন জবাব দিতে পারেননি তিনি।
বীমা বিশেষজ্ঞের বক্তব্য:
হিসাব বিশেষজ্ঞ ও একাধিক লাইফ বীমা কোম্পানির সাবেক মুখ্য নির্বাহী ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, লাইফ বীমা ব্যবসা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আজকে যে গ্রাহকের কাছ থেকে ১০০ টাকা প্রিমিয়াম নেয়া হচ্ছে তা কিন্তু মেয়াদ শেষে ফেরত দিতে হবে মুনাফাসহ। তাই মনে রাখতে হয় ১০০ টাকা থেকে কত টাকা বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে ১০০ টাকার বেশি ফেরত দেয়া যাবে!
তার মতে, ব্যয়ের যে হার নির্ধারন করা আছে তা মূলত রেশিও অনুসারে। আর এ কারণেই ১ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয়ের ক্ষেত্রে যেই হারে কমিশন খরচ হয়; ১০০ কোটিতেও সেই হারে কমিশন খরচ হয়। মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও নির্ধারণ করা হয়েছে রেশিও অনুসারে। এ কারণে প্রিমিয়াম আয় বাড়লে সেই হারে খরচও বাড়ে। ফলে আগের বছরগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় পুনর্ভরণ করা সম্ভব হয় না।
আবার ব্যয় বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ কমে যায়, যা কোম্পানিকে আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। আর এ কারণেই কোম্পানির আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে বলে মনে করেন ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল।



