কম প্রিমিয়ামের লোভে ভবন বীমায় বড় ক্ষতির ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের শহর ও শিল্পাঞ্চল দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগুন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগে সম্পদ ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বাস্তবতায় ভবনের সঠিক বীমা শ্রেণি নির্ধারণ এখন আর শুধু কারিগরি বিষয় নয়। এটি সম্পত্তির আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যবসার টিকে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।

কারণ, ভবনের নির্মাণধরনই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করে। এর ওপর নির্ভর করে কত প্রিমিয়াম দিতে হবে, কী ধরনের কভারেজ পাওয়া যাবে এবং ক্ষতির সময় কতটুকু দাবি পরিশোধ করা হবে।

বাংলাদেশে অগ্নি ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বীমা ব্যবস্থায় ভবনগুলোকে সাধারণত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এ শ্রেণিবিন্যাস আইডিআরএর ফায়ার ট্যারিফের ভিত্তিতে নির্ধারিত। প্রথম শ্রেণির ভবনগুলো সম্পূর্ণ কংক্রিট বা শক্তিশালী পাকা নির্মাণ হওয়ায় সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ভবনের প্রিমিয়ামও তুলনামূলক কম।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে সাধারণত ইটের দেয়াল ও টিনের ছাদযুক্ত ভবন অন্তর্ভুক্ত হয়। তৃতীয় শ্রেণির ভবনে ধাতব ও দাহ্য উপকরণের ব্যবহার বেশি থাকে। আর বাঁশ, চাটাই বা অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি অস্থায়ী ভবন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। এ ধরনের ভবনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাই এ শ্রেণির প্রিমিয়ামও সর্বোচ্চ।

ফায়ার ও সম্পত্তি বীমা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের নন-লাইফ বীমা ব্যবসার অন্যতম প্রধান শাখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট নন-লাইফ প্রিমিয়ামের একটি বড় অংশ এসেছে এ খাত থেকে। ফলে ভবনের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস শুধু ব্যক্তিগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি পুরো নন-লাইফ বীমা শিল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রিমিয়াম নির্ধারণে বীমাকৃত অর্থের পাশাপাশি ভবনের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও গুদাম ভবনের জন্য প্রিমিয়াম এক নয়। একইভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা দাঙ্গার কভারেজ যুক্ত হলে প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে।

কিছু কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির ভবনের প্রিমিয়াম হার ০.১২ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। তৃতীয় শ্রেণিতে তা ০.১৯ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে ১০ কোটি টাকার একটি কারখানা বা গুদামের ক্ষেত্রে ভবনের শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে বার্ষিক প্রিমিয়ামে কয়েক লাখ টাকার পার্থক্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সঠিক শ্রেণিতে বীমা করার অন্যতম সুবিধা হলো কম খরচে উপযুক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। প্রথম শ্রেণির ভবনের মালিকরা অনেক সময় অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ছাড় পান। ফায়ার অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার এবং উন্নত অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো সুবিধা এ ছাড় পাওয়ার অন্যতম কারণ। এতে একদিকে বীমা ব্যয় কমে। অন্যদিকে দুর্যোগের সময় পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ টিনশেড, আধাপাকা ও কাঁচা ঘরে বসবাস করে। গ্রামীণ এলাকায় টিন ও অস্থায়ী ভবনের সংখ্যা বেশি। উপকূলীয় অঞ্চলেও অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বাস করেন। ফলে দেশে চতুর্থ শ্রেণির ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা কম নয়। অথচ এসব ভবনের খুব অল্প অংশই কোনো ধরনের বীমা সুরক্ষার আওতায় রয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এসব অঞ্চলে সম্পত্তি ও ভবন বীমার বিস্তার এখনও অত্যন্ত সীমিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্পত্তি বীমার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে ভবনের ভুল শ্রেণিবিন্যাস যুক্ত হলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন নিহত এবং ৩৪১ জন আহত হয়েছেন। সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। বিপরীতে ফায়ার সার্ভিস প্রায় ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।

গত এক দশকে দেশে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ও সম্পদের ক্ষতি বাড়লেও ভবন বীমার বিস্তার এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বড় দুর্যোগের পর ক্ষতির একটি বড় অংশ ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়।

দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে তৈরি পোশাক কারখানা, রাসায়নিক ও প্লাস্টিক গুদাম, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণকারী স্থাপনা। টিনশেড মার্কেট ও পুরান ঢাকার মিশ্র-ব্যবহারের ভবনও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থাপনায় বড় ধরনের আগুন লাগলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বীমা দাবি ও পুনর্বীমা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

তবে সাময়িকভাবে কম প্রিমিয়াম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভুল শ্রেণিতে বীমা করানোর ঝুঁকি অত্যন্ত বড়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত নির্মাণধরন গোপন করে ভবনকে কম ঝুঁকির শ্রেণিতে দেখানো হয়। কিন্তু ক্ষতির সময় এ ধরনের ভুলের কারণে ‘অ্যাভারেজ ক্লজ’ প্রয়োগ হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, ১০ কোটি টাকার একটি ভবনের প্রকৃত পুনঃস্থাপন মূল্য যদি ২০ কোটি টাকা হয়, তাহলে সেটি আন্ডারইন্স্যুরড হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অবস্থায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হলে বীমা কোম্পানি অনুপাতিক হারে মাত্র ১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারে। বাকি অর্থ ভবনের মালিককে নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করতে হয়।

আবার ঝুঁকিপূর্ণ টিন বা অস্থায়ী ভবনকে প্রথম শ্রেণির ভবন হিসেবে দেখিয়ে বীমা করা হলে দাবি নিষ্পত্তির সময় বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। তথ্য গোপন বা ভুল উপস্থাপনের অভিযোগে দাবি আংশিক বা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

এ কারণেই বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণত বড় ঝুঁকির ক্ষেত্রে সাইট পরিদর্শন, ছবি, নকশা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনের ভুল শ্রেণিবিন্যাস দেশের বীমা খাতে আন্ডারইন্স্যুরেন্সের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে বড় অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিপূরণ পরিশোধে সামগ্রিক চাপ তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তবতায় ভবনের সঠিক বীমা শ্রেণিবিন্যাস এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বীমার বিষয় নয়। এর সঙ্গে আর্থিক সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জড়িত।

কম প্রিমিয়ামের লোভে ভুল শ্রেণিতে বীমা করলে ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। তাই ভবনের প্রকৃত তথ্য গোপন না করে সঠিক শ্রেণিতে বীমা করা জরুরি। এটিই সম্পত্তি সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।