গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের অবৈধ ব্যয়: ৫ বছরে খেয়ে ফেলেছে ১০৪ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১০ পিএম

আবদুর রহমান আবির: ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমা বাড়ানোর পরও অতিরিক্ত ব্যয় কমেনি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের। বিগত ৫ বছরে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয়ের নামে ১০৪ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছে। বীমা আইন অনুসারে এই অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে অতিরিক্ত ব্যয় কোম্পানির আর্থিক ভিত দুর্বল করে দেয়। কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের মতে, অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে কোম্পানির তহবিল তছরুপ করা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার।

ব্যয়সীমার তুলনামূলক চিত্র: ১৯৫৮ বনাম ২০১৮ বিধি

১৯৫৮ সালের পুরনো বিধি অনুসারে, ফায়ার ও অন্যান্য বীমায় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ খরচের সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিতে এই সীমা কয়েক ধাপে বাড়িয়ে ১৫ কোটি টাকার স্ল্যাবে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়। একইভাবে মেরিন ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও বাড়ানো হয় ব্যয়সীমা।

তুলনামূলক হিসাব করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স ৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। ২০১৮ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিধিমালা অনুসারে ২০২৪ সালের মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের ব্যয় করতে পারে ২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর ব্যয় করেছে ৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১০৬.৭৮ শতাংশ বেশি।

অপর দিকে ১৯৫৮ সালের বিধিমালা অনুসারে ব্যয় করতে পারে ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমার সাথে ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিমালার ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা তুলনা করলে দেখা যায়, অনুমোদিত ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে  ১১৩ শতাংশ, যা  দ্বিগুণের বেশি।

পাঁচ বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ১০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স মোট ৪৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। প্রবিধানমালা অনুযায়ী, এই প্রিমিয়াম সংগ্রহের বিপরীতে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুমোদিত সীমা ছিল ১৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। অথচ এই সময়ে কোম্পানিটি খরচ করেছে ২৩৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

অর্থাৎ পাঁচ বছরে কোম্পানিটি ১০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে, যা কোম্পানিটির অনুমোদিত ব্যয়সীমার চেয়ে ৭৬.৬২ শতাংশ বেশি।

ব্যয়ের রেকর্ড ২০২৩ সালে

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের গত ১২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত ব্যয় করে  ২০২৩ সালে। ওই বছর ৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্যয় করে ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর ব্যয়ের অনুমোদন ছিল মাত্র ২৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ১০৬.৭৮ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

সবচেয়ে কম ব্যয় করে ২০১৯ সালে

২০১৮ সালে ব্যয় সীমা বাড়িয়ে সংশোধিত বিধিমালা করে সরকার। এর পরের বছর ২০১৯ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কম খরচ করে। যা বিগত ১২ বছরের (২০১৩-২০২৪ সাল) মধ্যে সবচেয়ে কম।

অতিরিক্ত ব্যয়ের এই ধারা ২০২৪ সালেও অব্যাহত ছিল গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে। ওই বছর কোম্পানিটি ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করে। ৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা খরচের অনুমোদন থাকলেও কোম্পানিটির খরচ দাঁড়ায় ৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

এর আগে ২০২১ সালে ৯০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২০২০ সালে ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স।

ব্যয় সীমা বাড়ানোর আগেও অতিরিক্ত ব্যয় করেছে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল –এই পাঁচ বছরে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে ১৩৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করেছে ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অথচ ১৯৫৮ সালের বীমা বিধি অনুসারে, ওই সময় কোম্পানিটির মোট ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা।

এই হিসাবে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স ১০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে।

এর মধ্যে- ২০১৭ সালে, ৪ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে। এ ছাড়াও ২০১৮ সালে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ৭৪ লাখ টাকা এবং ২০১৩ সালে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স।

ব্যবসা কমলেও বেড়েছে অতিরিক্ত খরচ

আর্থিক প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২২ সালে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম ছিল ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। তবে প্রিমিয়াম সংগ্রয়ের পরিমাণ কমলেও ব্যয় কমেনি। ২০২৪ সালেই কোম্পানিটি অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা বেশি খরচ করেছে।

২০২৩ সালেও গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম সংগ্রহ ১৬.৭৩ শতাংশ কমে ৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায় নেমে আসে। অথচ ওই বছরও কোম্পানিটি ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছে। ২৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন থাকলেও কোম্পানিটি খরচ করে ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

বিষয়ে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, বীমা আইনে বেধে দেয়া ব্যয়সীমা আমরা মানতে পারিনি- এটা ঠিক। তবে খরচ কম দেখানোর জন্য আমাদের কোম্পানিতে কোন ব্যয় গোপন করা হয় না। আর এ কারণেই আমাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় একটু বেশি। তবে এই অতিরিক্ত ব্যয় আমরা কমিয়ে আনার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, কোম্পানির যেসব ব্রাঞ্চ অফিস পর্যাপ্ত ব্যবসা করতে পারছে না, সেগুলো মার্জ করার জন্য এরইমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কোম্পানির গাড়ির সংখ্যা আরো কমিয়ে আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পনের বছরের পুরনো গাড়িগুলো বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে এসব পুরনো গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে তা বন্ধ হবে।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সকে কর্মীবান্ধব উল্লেখ করে জামিরুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারীতে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়লেও আমাদের কোম্পানি তার কর্মীদের বেতন-ভাতা বন্ধ করেনি। সেই দুঃসময়েও পূর্ণ সাপোর্ট নিয়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে কোম্পানি। এ কারণে ব্যবসা কমলেও কোম্পানির খরচ কমেনি।

ব্যবসা কমে যাওয়ার যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন তার কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। কোম্পানির প্রিমিয়াম সংগ্রহের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনা মহামারীর বছরেও কোম্পানিটির প্রিমিয়াম সংগ্রহ ১২.৪২ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ কোটি ৬৯ কোটি টাকা।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।