বীমা শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ: নিবন্ধন নবায়ন ফি বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের স্বার্থ সুরক্ষা

তনয় কুমার সাহা: বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে বীমা খাত একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। এই খাতের শৃঙ্খলা ও বিকাশে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সম্প্রতি ২০২৬ সাল থেকে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি ধাপে ধাপে বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

একটি ভারসাম্যহীন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বীমা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং উদীয়মান খাত। ২০১৮ সালে সরকার এই খাতের বিকাশের কথা চিন্তা করে নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজারে ৩.৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১ টাকায় নামিয়ে এনেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই ফি-কে ২০৩২ সাল নাগাদ প্রতি হাজারে ৫ টাকা করার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা এই শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ব্যয়ের যৌক্তিকতা বনাম শিল্পের স্বার্থ: প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই ফি বৃদ্ধি? যদি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর নিজস্ব জমি ক্রয়, প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য এই অর্থ প্রয়োজন হয়, তবে তার দায়ভার কেন একটি রুগ্নপ্রায় শিল্পের ওপর চাপানো হবে? নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারকেই (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ) এগিয়ে আসতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার খরচ মেটানোর জন্য খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই শোষকের আসনে বসিয়ে দেওয়াটা কোনোভাবেই সমিচীন নয়।

অংকের হিসাবে ভয়াবহতা: বিষয়টি সাধারণের কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু একটি উদাহরণ দিলেই এর গভীরতা বোঝা যাবে। ধরুন একটি কোম্পানির বার্ষিক গ্রস প্রিমিয়াম আয় ১০০ কোটি টাকা।

  • ২০১৮ সালের বিদ্যমান হারে (১.০০ টাকা): তাদের ফি ছিল ১০ লক্ষ টাকা।
  • ২০২৬ সালের নতুন হারে (২.৫০ টাকা): ফি দিতে হবে ২৫ লক্ষ টাকা (১৫০% বৃদ্ধি)।
  • ২০৩২ সালের হারে (৫.০০ টাকা): ফি হবে ৫০ লক্ষ টাকা (৫০০% বৃদ্ধি)।

কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

এই অতিরিক্ত অর্থ কোনো আকাশ থেকে আসবে না; এটি বীমা কোম্পানিগুলোর 'উদ্বৃত্ত' থেকে কাটা যাবে।

এর ফলে:

১. বীমা গ্রাহকগণ: সাধারণ গ্রাহকরা তাদের জীবন বীমার পলিসিতে প্রাপ্য বোনাস বা মুনাফা থেকে বঞ্চিত হবেন।

২. শেয়ারহোল্ডারগণ: বিনিয়োগকারীরা তাদের লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড হারাবেন।

৩. শিল্পের সক্ষমতা: অতিরিক্ত খরচের চাপে কোম্পানিগুলো তারল্য সংকটে পড়বে এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।

আইনি অসংগতি: ২০২৬ সালের জন্য কোম্পানিগুলো অলরেডি ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাদের ফি পরিশোধ করে দিয়েছে। এখন নতুন করে সেই বছরের জন্যই বাড়তি ফি দাবি করা আইনের ‘ভুতাপেক্ষ’ (Retrospective) প্রয়োগ, যা প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতির পরিপন্থী।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ হলো শিল্পকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা এবং এর বিকাশ নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা নয়। বীমা খাতকে বাঁচাতে হলে ২০১৮ সালের সেই যৌক্তিক ১ টাকার হার বহাল রাখা এবং আইডিআরএ-র উন্নয়নের জন্য সরকারি বাজেট নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের বীমার টাকা দাপ্তরিক বিলাসিতায় ব্যয় হবে, যা পুরো খাতের প্রতি জনগণের আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেবে।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট