আসলাম আলমের দুয়ার-প্রীতির কারণে বিপাকে বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’ এর মধ্যকার ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের বীমা কোম্পানিগুলোকে। সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলমের ‘দুয়ার-প্রীতি’র ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন ফি এক লাফে ৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এরই মধ্যে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী ফি পরিশোধ করা সত্ত্বেও, সংশোধিত বিধিমালার দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়ে বীমা কোম্পানিগুলোকে চাপ দিচ্ছে আইডিআরএ। আর এই বর্ধিত ফি না দেয়ায় কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স নবায়ন আটকে রেখেছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।
ফলে লাইসেন্সবিহীন অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাতের সকল লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানি।
অভিযোগ উঠেছে, বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দুয়ার সার্ভিস নিয়ে বারবার আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নেয়নি আইডিআরএ। রাতারাতি নাম পরিবর্তন করে ‘ইউএমপি’ সার্ভিসকে কার্যকর করা হয় ‘আইআইএমএস’ নামে। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, দুয়ার সার্ভিসের সাথে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলমের ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে।
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’ এর পাওনা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানায় বীমা কোম্পানিগুলো। মূলত এই এসএমএস সার্ভিসটি বিনামূল্যে প্রদানের নাম করে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিতেই নিবন্ধন নবায়ন ফি ৫ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দিতেই বীমা আইনের তোয়াক্কা না করে এই বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে।
বীমা আইন-২০১০ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি পরিশোধ করে নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করার বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের নিবন্ধনের জন্য কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই পূর্ববর্তী বছরের গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ভিত্তি করে প্রতি হাজারে ১ টাকা হারে ফি পরিশোধ করেছে।
তবে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা- ২০১২’ অধিকতর সংশোধন করে সরকার। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিগুলোকে এই বাড়তি নিবন্ধন নবায়ন ফি পরিশোধ করতে নির্দেশ দেয় আইডিআরএ।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার পরিশোধিত ফি ভুতাপেক্ষ কার্যকরী করে বর্ধিত হারে আদায়ের কোনো এখতিয়ার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনে নেই। আইনি সময়সীমা পার হওয়ার পর বিধিমালা সংশোধন করে বাড়তি ফি দাবি করাকে ‘স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী- ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামে ২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য হবে প্রতি হাজারে ৫ টাকা।
এর আগে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি ছিল প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ১ টাকা।
এদিকে হঠাৎ এই বর্ধিত ফি’র কারণে কোম্পানিগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক হিসেবে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ, ২০২৫ সালের নভেম্বরে পরিশোধিত ফি ইতিমধ্যে ২০২৪ সালের হিসাব সমাপনীতে খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখন নতুন করে বাড়তি অর্থ পরিশোধ করলে কোম্পানিগুলোর খরচের হার বেড়ে যাবে, যা সাধারণ বীমা গ্রাহকদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র সেক্রেটারি জেনারেল ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শফিক শামীম পিএসসি (অব.) বলেন, ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নে ফি কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালেই পরিশোধ করেছে। তবে বিধিমালা সংশোধনের পর বর্ধিত ফি এখনো কোন কোম্পানি পরিশোধ করেনি।
আমরা মনে করি, ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নে বর্ধিত ফি আদায়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং আগের হারেই এ বছরের নিবন্ধন নবায়ন করা উচিত। কারণ, বিধিমালা সংশোধনের আগেই কোম্পানিগুলো ফি জমা দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে নতুন হার ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) থেকে এ বিষয়ে একটি আর্জি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান বিআইএফ’র সেক্রেটারি জেনারেল মো. শফিক শামীম।
একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিআইএ’র নির্বাহী সদস্য ও জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী এস এম নুরুজ্জামান। তিনি জানান, নভেম্বরে পরিশোধিত ফি ফেব্রুয়ারিতে এসে বাড়ানো যুক্তিসম্মত নয়। এতে কোম্পানিগুলো বড় ধরনের আর্থিক জটিলতায় পড়বে। যেহেতু ২০২৬ সালের নবায়ন ফি এরইমধ্যে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে, তাই দ্রুত নবায়ন করা হোক।
এমনিতেই বীমা কোম্পানিগুলো ফান্ড সংকটের কারণে গ্রাহকের দাবির টাকা দিতে পারছে না; সেখানে এতো ফি’র বোঝা চাপানো উচিত হবে না। এক্ষেত্রে ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের বিষয়টি বাদ দিতে বিধিমালাটি পুনরায় সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিআইএ’র এই নির্বাহী সদস্য।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বীমা ও পুঁজিবাজার অনুবিভাগ) মো. সাঈদ কুতুব এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ফজলুল হক এর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।



