হাওরের কৃষিতে অনিশ্চয়তা: কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না ফসল বীমা?

রাজ কিরণ দাস: সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেটসহ দেশের হাওর অঞ্চলে আবারও বোরো ধান নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। প্রাথমিক হিসাবে সাত হাওর জেলায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর বোরো জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় দেড় লাখ কৃষক পরিবারের ওপর। শুধু সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমি তলিয়ে গেছে এবং বোরো উৎপাদনে ২ লাখ টনের বেশি ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতি বছর এমন ঝুঁকির মুখে পড়লেও হাওরের অধিকাংশ কৃষক এখনো ফসল বীমার আওতায় নেই। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, হাওর অঞ্চলের ৯৫ শতাংশের বেশি কৃষক বীমার আওতায় নেই। অথচ এই অঞ্চলে বোরো ধানই কৃষকের প্রধান আয়ের উৎস। এক মৌসুমের ধান নষ্ট হলে অনেক পরিবার সারা বছরের খাদ্য, ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে বড় ধরনের সংকটে পড়ে।

বাংলাদেশে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক ফসল বীমা বা ওয়েদার ইনডেক্স-বেজড ক্রপ ইন্স্যুরেন্স নিয়ে কিছু পাইলট প্রকল্প চালু থাকলেও তা এখনো বড় পরিসরে কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। যদিও গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আবহাওয়া সূচকভিত্তিক ফসল বীমা নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল অতিবৃষ্টি, খরা ও তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে পারে। এই ব্যবস্থায় স্যাটেলাইট ও গ্রাউন্ড স্টেশনের আবহাওয়া তথ্য ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণের শর্ত নির্ধারণ করা হয়।

তবে হাওরের কৃষকদের কাছে ফসল বীমা এখনো জনপ্রিয় না হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, কৃষকদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব আছে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এখনো মনে করেন, বীমা করলে টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন হবে বা দাবি আদায়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাইলট উদ্যোগ থাকলেও প্রচারণা ও মাঠপর্যায়ের ব্যাখ্যা যথেষ্ট না হওয়ায় কৃষকরা এর সুবিধা ভালোভাবে বুঝতে পারছেন না।

দ্বিতীয়ত, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করতে সময় লাগে। কিন্তু হাওরের কৃষকের প্রয়োজন হয় দ্রুত নগদ সহায়তা, কারণ ফসল ডুবে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ঋণ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবারের খরচের চাপ তৈরি হয়। আবহাওয়া সূচকভিত্তিক বীমায় ক্ষতিপূরণ দ্রুত দেয়ার সুযোগ থাকলেও আবহাওয়া স্টেশন বা স্যাটেলাইটের তথ্যের সঙ্গে মাঠের প্রকৃত ক্ষতির মিল নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। এতে কৃষকদের একটি অংশ বীমাকে নির্ভরযোগ্য সহায়তা হিসেবে নিতে পারছেন না।

তৃতীয়ত, প্রিমিয়ামের খরচ বড় বাধা। হাওর এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এখানে বীমা দেয়া ব্যয়সাপেক্ষ। ফলে প্রিমিয়াম তুলনামূলক বেশি হয়। বর্তমানে পাইলট প্রকল্পে বোরো ফসলের ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম সাধারণত বীমাকৃত অংকের ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, ১ একর জমির ফসলের মূল্য ১২ হাজার টাকা ধরা হলে কৃষককে প্রায় ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। অনেক দরিদ্র কৃষকের পক্ষে চাষের খরচ, সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরির পাশাপাশি এই বাড়তি খরচ বহন করা কঠিন।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো জমির মালিকানা। হাওরের অনেক কৃষক নিজের জমিতে চাষ করেন না; তারা বর্গা চাষি বা ভূমিহীন চাষি। বীমা করতে গেলে জমির মালিকানা বা কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক অনেক সময় বীমার সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যান। এ কারণে ফসল বীমা কার্যকর করতে হলে শুধু জমির মালিক নয়, প্রকৃত চাষিকেও বীমার আওতায় আনার ব্যবস্থা জরুরি।

সরকারি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাও এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সময়ে ফসল বীমা চালুর কথা বলা হলেও তা এখনো পাইলট প্রকল্পের বাইরে বড় আকারে বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে বেশিরভাগ পাইলট প্রকল্পে প্রিমিয়ামের বড় অংশ আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী বা এনজিও বহন করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ভর্তুকি কাঠামো না থাকায় সাধারণ কৃষকের জন্য বীমা এখনো সহজলভ্য হয়নি।

হাওর অঞ্চলে গত পাঁচ বছরের চিত্র দেখলে ঝুঁকির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালে আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার হাওরে বড় ধরনের ফসলহানি হয়। ২০২৩ সালে এপ্রিলের শেষে আকস্মিক ঢলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। ২০২৫ সালে বড় আগাম বন্যা না হলেও অতিবৃষ্টিতে কিছু নিচু এলাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর ২০২৬ সালে আবারও মে মাসের শুরুতে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

চলতি সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সূত্র অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে নদী ও খাল খননের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর রক্ষায় শুধু বাঁধ নির্মাণ যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি ও উজানের পানির ঝুঁকি বিবেচনায় কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজ ফসল বীমা ব্যবস্থা দরকার। এ ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সরকার, বীমা কোম্পানি, ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয় কৃষি সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রিমিয়ামে সরকারি ভর্তুকি, বর্গা চাষিদের অন্তর্ভুক্তি, সহজ নিবন্ধন, মোবাইলভিত্তিক দাবি নিষ্পত্তি এবং মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে হাওরের কৃষিতে ফসল বীমা কার্যকর নিরাপত্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

হাওরের কৃষকের জন্য ফসল বীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি হতে পারে দুর্যোগের পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর একটি বাস্তব উপায়। তবে তা জনপ্রিয় করতে হলে কৃষকের আস্থা অর্জন, খরচ কমানো এবং ক্ষতিপূরণ দ্রুত নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।