পাহাড়ি মানুষের বীমা সুরক্ষায় ভাষাই সবচেয়ে বড় বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে বীমা খাতের অনুপ্রবেশ হার এখনও কম। দেশের মোট বীমা অনুপ্রবেশের হার জিডিপির মাত্র ০.৩৩ থেকে ০.৫ শতাংশের মধ্যে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক নিচে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বীমা সেবার উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাষাগত বাধা, সচেতনতার ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে দুর্বল উপস্থিতি ও আস্থার সংকটের কারণে অনেক পাহাড়ি মানুষ বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য অঞ্চলে বীমা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভাষা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বীমা পলিসিতে ব্যবহৃত অনেক প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি শব্দ সাধারণ মানুষের কাছেই জটিল মনে হয়। অর্পণ মূল্য (সারেন্ডার ভ্যালু), ল্যাপসড পলিসি, বোনাস সমর্পণসহ বিভিন্ন পরিভাষা বোঝা অনেকের জন্য সহজ নয়। পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকায় এসব জটিল বাংলা পরিভাষা তাদের কাছে আরও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই শুরুতেই বীমা সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

ভৌগোলিক বাস্তবতাও বীমা বিস্তারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য এলাকার অনেক গ্রাম দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এবং একেকটি গ্রামের মধ্যে দূরত্বও অনেক বেশি। ফলে বীমা কোম্পানির মাঠকর্মীদের জন্য নিয়মিত গ্রাহক যোগাযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ মাঠকর্মী সমতল অঞ্চল থেকে আসায় স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত থাকে। এতে গ্রাহকদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। পাশাপাশি যাতায়াত ব্যয় ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে বীমা বিস্তারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। দেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাব পাহাড়ি এলাকাতেও পড়েছে। অনেকের ধারণা, প্রিমিয়াম পরিশোধের পরও প্রয়োজনের সময় বীমা সুবিধা পাওয়া সহজ নয়।

এই উদ্বেগের পেছনে জাতীয় পর্যায়ের কিছু পরিসংখ্যানও রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো প্রায় ৪,৬০০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে দাবি পরিশোধ করা হয়েছে ২,২২১ কোটি টাকা, যা মোট প্রিমিয়াম আয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ।

একই সময়ে বীমা খাতে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯,৬২৪ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য নয় মাসে বীমা খাতের গড় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে লাইফ বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৩৫.১৮ শতাংশ এবং নন-লাইফ বীমা খাতে ৭.৫৫ শতাংশ।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪,৬০০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয়ের মধ্যে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো সংগ্রহ করেছে ৩,০৫০ কোটি টাকা এবং দাবি পরিশোধ করেছে ২,১০৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো ১,৫৪৭ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করলেও দাবি পরিশোধ করেছে মাত্র ২৭৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের চিত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

পার্বত্য অঞ্চলের অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, পলিসি বিক্রির সময় বীমা প্রতিনিধিরা সহজ ভাষায় বিভিন্ন সুবিধার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু মেয়াদ শেষে অর্থ উত্তোলন বা দাবি নিষ্পত্তির সময় নানা ধরনের কাগজপত্র, শর্ত ও প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এমন অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বীমা সম্পর্কে অনাগ্রহ তৈরি করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বীমা খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ লিফলেট, ব্রোশিওর ও প্রচারসামগ্রী বাংলায় প্রস্তুত করা হয়। চাকমা, মারমা বা অন্যান্য স্থানীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা তথ্যপত্র সাধারণত থাকে না। ফলে বীমা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে বীমা সেবা সম্প্রসারণ করতে হলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তারা মনে করেন, পলিসির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও সুবিধাগুলো স্থানীয় ভাষায় উপস্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের মাঠকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিলে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আস্থা, উভয়ই বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত অন্তর্ভুক্তিমূলক মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স পলিসি চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় সহজ তথ্যপত্র প্রকাশ, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং নিয়মিত গ্রাহক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমানে বীমা সুরক্ষার বাইরে থাকা পাহাড়ি মানুষ ধীরে ধীরে আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আসতে পারবেন এবং দেশের বীমা খাতও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।