২৪ কোটির বেশি এমএফএস অ্যাকাউন্ট, নেই লেনদেন সুরক্ষা বীমা

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২৪.৫ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৩৯.৫ শতাংশ অ্যাকাউন্ট সক্রিয়। দেশে বর্তমানে ১৩টি এমএফএস অপারেটর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এত বড় ডিজিটাল আর্থিক খাত গড়ে উঠলেও গ্রাহকদের জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট ট্রানজেকশন বীমা বা মোবাইল ওয়ালেট সুরক্ষা বীমা চালু হয়নি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রাহকের অজান্তে বিকাশ, নগদ, রকেট বা অন্য কোনো এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি বর্তমানে নির্ভর করে ঘটনার ধরন, তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএফএস নীতিমালা সেবা পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করলেও গ্রাহকদের জন্য আলাদা মোবাইল ওয়ালেট ট্রানজেকশন বীমা বাধ্যতামূলক করার কোনো ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি।

লেনদেনের বিশাল পরিমাণ এই ঝুঁকির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এমএফএস প্রতিষ্ঠান নগদ ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রায় ১,১১,৩৫৫ কোটি টাকার লেনদেন করেছে। প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হলেও গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষায় কোনো বিশেষায়িত বীমা ব্যবস্থা চালু নেই।

এমএফএস খাতে সবচেয়ে বড় অংশীদার বিকাশ। বিভিন্ন শিল্পখাত বিশ্লেষণ ও বাজার পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিকাশের লেনদেন অংশীদারিত্ব প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নগদ, যার অংশ প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। রকেটের অংশীদারিত্ব প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ। বাকি অংশ অন্যান্য অপারেটরের হাতে রয়েছে।

বাংলাদেশের বীমা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আলোচনা থাকলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য মোবাইল ওয়ালেটভিত্তিক সাইবার প্রতারণা বীমা এখনো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। এমএফএস অপারেটরগুলো প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করলেও বীমাভিত্তিক ক্ষতিপূরণ সুরক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

দেশের কয়েকটি বীমা প্রতিষ্ঠান ও ইনস্যুরটেক উদ্যোগ ডিজিটাল বীমা ও সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সাইবার বীমা নিয়ে কাজ করছে এবং বাংলাদেশ উপযোগী সাইবার বীমা পলিসি উন্নয়নের কথা জানিয়েছে। গার্ডিয়ান লাইফ ডিজিটাল বীমা সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। মেটলাইফ বাংলাদেশও অনলাইন ক্লেইম, গ্রাহকসেবা ও ডিজিটাল সেবার বিভিন্ন সুবিধা চালু করেছে। তবে এসব উদ্যোগ মূলত করপোরেট সাইবার ঝুঁকি, জীবনবীমা, স্বাস্থ্যবীমা বা প্রচলিত বীমা সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যক্তিগত এমএফএস অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং বা অননুমোদিত লেনদেনের জন্য কোনো ব্যাপক খুচরা বীমা পণ্য এখনো বাজারে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, সাইবার জালিয়াতি ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ঠেকাতে ২০২৬ সালে বেশ কয়েকটি নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, কোনো ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড থেকে এমএফএস ওয়ালেটে অর্থ যোগ করার ক্ষেত্রে কার্ডধারী ও এমএফএস অ্যাকাউন্টধারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম এক হওয়া বাধ্যতামূলক করা। এর ফলে অন্যের কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কোনো গ্রাহক নতুন মোবাইল ফোনে এমএফএস অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করলে বা পিন পরিবর্তন করলে ২৪ ঘণ্টার একটি ‘কুলিং পিরিয়ড’ কার্যকর হবে। এই সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর বা ক্যাশ-আউটের ওপর সীমাবদ্ধতা থাকবে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতারণা ও অননুমোদিত লেনদেনের ঝুঁকি কমানো।

নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে প্রতিটি অপারেটরে একটি মাত্র ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট রাখার নিয়ম করা হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাপের সঙ্গে নির্দিষ্ট মোবাইল ফোনের সংযোগ বা ‘ডিভাইস বাইন্ডিং’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে হ্যাকিং, পরিচয় চুরি বা সাইবার প্রতারণার কারণে অর্থ হারানো গ্রাহকদের বীমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কোনো যৌথ ট্রানজেকশন ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি।

এদিকে দেশে অনলাইন প্রতারণা, হুন্ডি, অনলাইন জুয়া এবং অবৈধ ডিজিটাল লেনদেনে এমএফএসের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় এমএফএসের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া ও বেটিং লেনদেনের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাস এবং জুনের শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির অভিযোগে একাধিক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে।

ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও বিক্রির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালে সিআইডি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও এমএফএস অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এসব ঘটনা পরিচয় চুরি, অ্যাকাউন্ট দখল এবং আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে।

এই চক্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডি দেশের অবৈধ ১১৬টি জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) তালিকা পাঠিয়েছে।

ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারকারীদের জন্য বীমাভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের কোটি কোটি এমএফএস গ্রাহক এখনো একই ধরনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

সিঙ্গাপুরের পিওএসবি/ডিবিএস পে-লা! ব্যবহারকারীদের জন্য ‘মোবাইল ওয়ালেট প্রটেক্ট’ নামে সুরক্ষা সুবিধা রয়েছে। এতে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাকাউন্ট টেকওভার এবং অননুমোদিত লেনদেনজনিত ক্ষতির মতো ঝুঁকি কাভারের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সুরক্ষা বছরে মাত্র ৬.৯৯ সিঙ্গাপুরি ডলার থেকে কেনা যায়।

সিঙ্গাপুরের সিংটেল ড্যাশও মোবাইল ওয়ালেটভিত্তিক আর্থিক সেবার সঙ্গে বীমা ও সঞ্চয়ধর্মী পণ্য যুক্ত করেছে। ড্যাশ ইজি আর্ন এবং ড্যাশ পিইটি-এর মতো সেবাগুলো ডিজিটাল ওয়ালেটের সঙ্গে আর্থিক সুরক্ষা পণ্য একীভূত করার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভারতে রিজার্ভ ব্যাংকের গ্রাহক সুরক্ষা কাঠামোয় অননুমোদিত ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের দায় সীমিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রাহকের কোনো গাফিলতি না থাকলে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ জানালে অনেক ক্ষেত্রে ‘জিরো লায়াবিলিটি’ সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠান সাইবার ঝুঁকি, পরিচয় চুরি, ব্যক্তিগত সম্পদ সুরক্ষা এবং ডিজিটাল প্রতারণাজনিত ক্ষতির জন্য বিশেষায়িত বীমা পণ্য সরবরাহ করে। তবে বাংলাদেশের এমএফএস গ্রাহকদের জন্য একই ধরনের খুচরা মোবাইল ওয়ালেট ট্রানজেকশন বীমা এখনো চালু হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৪.৫ কোটি নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের এই বিশাল খাতকে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার ওপর ছেড়ে দেয়া যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখা এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় মোবাইল ওয়ালেট ট্রানজেকশন বীমা, সাইবার ফ্রড কভার এবং পরিচয় চুরি সুরক্ষার মতো বীমা পণ্য চালুর বিষয়ে এখনই নীতিগত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।