দুর্বল বীমা কোম্পানিতে গ্রাহকের সঞ্চয় নিরাপদ তো?

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে বর্তমানে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৮২টি। এর মধ্যে বেশির ভাগ লাইফ বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো, তারা মেয়াদপূর্তির পরও সময়মতো দাবি পরিশোধ করতে পারে না। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, লাইফ বীমা খাতে মোট অপরিশোধিত বা অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৩২ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা মোট দাবির ৩৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় অঙ্কের অনিষ্পন্ন দাবি থাকা সত্ত্বেও নতুন গ্রাহকরা এখনও আর্থিকভাবে দুর্বল অনেক কোম্পানিতে পলিসি নিচ্ছেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই পুরনো গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু কোম্পানি নতুন গ্রাহকদের জমা দেয়া প্রিমিয়াম ব্যবহার করে পুরনো গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং পলিসিধারীদের পাওনা অর্থ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কোনো লাইফ বীমা কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে গ্রাহকদের বছরের পর বছর ধরে জমা দেয়া কোটি কোটি টাকার প্রিমিয়ামের কী হবে? বাস্তবতা হলো, কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়লে পলিসিধারীদের অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও তৈরি হতে পারে। অনেক সময় দাবি নিষ্পত্তি, মেয়াদপূর্তির অর্থ পরিশোধ এবং অন্যান্য দায় নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এতে গ্রাহকের সঞ্চয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
একজন পলিসিধারীর মৃত্যুর পর তার মনোনীত ব্যক্তি বা নমিনিও ঝুঁকির বাইরে নন। যদি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায় বা লাইফ ফান্ডে ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে মৃত্যুদাবির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। ফলে যে পরিবার আর্থিক নিরাপত্তার আশায় লাইফ বীমা করেছিল, তারা উল্টো আর্থিক সংকটে পড়ে যেতে পারে।
একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে সঞ্চয়ভিত্তিক ও এন্ডাওমেন্ট লাইফ বীমার ক্ষেত্রেও। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক গ্রাহককে টাকা পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। এতে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, অবসরকালীন ব্যয় বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আর্থিক সংকটে থাকা বীমা কোম্পানিগুলো অনেক সময় বোনাস ও লভ্যাংশ কমিয়ে দেয় বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। অথচ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ভিত্তিক লাইফ বীমার বড় আকর্ষণই হলো এই বোনাস ও লভ্যাংশ। এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পলিসির প্রকৃত রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং গ্রাহকদের প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধাও কমে যায়।
জরুরি প্রয়োজনে পলিসি সারেন্ডার করতে গেলেও অনেক গ্রাহক নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানি উচ্চ হারে কর্তন করে, সারেন্ডার মূল্য কমিয়ে দেয় অথবা অর্থ ফেরত দিতে দীর্ঘ সময় নেয়। ফলে বহু গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম অর্থ হাতে পান।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপও কম নয়। দাবি আদায়, মেয়াদপূর্তির টাকা বা সারেন্ডার মূল্য পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহককে বছরের পর বছর কোম্পানির অফিসে ঘুরতে হয়। কেউ কেউ আইনি লড়াই বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারস্থও হন। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে, ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো লাইফ বীমা খাতের প্রতি জনআস্থাকেও দুর্বল করে। বীমা খাতের ভিত্তিই হলো গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস। কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং নতুন গ্রাহক বীমা নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
বাংলাদেশে বীমা প্রবেশহার এখনও জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানি, অনিষ্পন্ন দাবি এবং আস্থার সংকট বীমা খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশে লাইফ বীমা খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক পলিসিধারী প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। ফলে বড় কোনো লাইফ বীমা কোম্পানি গভীর আর্থিক সংকটে পড়লে লাখো পলিসিধারী এবং তাদের পরিবার সরাসরি আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
তাহলে সাধারণ গ্রাহক কীভাবে বুঝবেন কোনো লাইফ বীমা কোম্পানি আর্থিকভাবে দুর্বল কি না? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পলিসি নেয়ার আগে কোম্পানির দাবি নিষ্পত্তির হার, সলভেন্সি মার্জিন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, লাইফ ফান্ডের আকার ও প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পারফরম্যান্স যাচাই করা উচিত। পাশাপাশি কম প্রিমিয়ামে অস্বাভাবিক বেশি রিটার্নের প্রতিশ্রুতি পেলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু দুর্বল কোম্পানি দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, সেটিও বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত তদারকির সীমাবদ্ধতা, আর্থিক তথ্য প্রকাশে ঘাটতি, সম্পদ ও দায়ের যথাযথ মূল্যায়নে বিলম্ব, নতুন মূলধন সংগ্রহে ব্যর্থতা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বাংলাদেশের বীমা খাতে এখনও ব্যাংক আমানতের মতো কার্যকর কোনো পলিসিহোল্ডার প্রোটেকশন ফান্ড বা গ্যারান্টি ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো বীমা কোম্পানি ব্যর্থ হলে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা সীমিত। এ কারণে কোনো বীমা কোম্পানি ব্যর্থ হলেও গ্রাহকদের ন্যূনতম সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর পলিসিহোল্ডার সুরক্ষা তহবিল বা গ্যারান্টি ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা কোম্পানির আর্থিক তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছতা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, শক্তিশালী তদারকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার জন্য নেয়া লাইফ বীমাই অনেকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইফ বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।



