অনিয়ম-দুর্নীতি সবই করেছেন আইডিআরএ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক

নিজস্ব প্রতিবেদক: মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক। এই সময়ে তিনি অবৈধ কমিশন, বাকী ব্যবসা, অতিরিক্ত ব্যয়সহ নানান অনিয়ম-দুর্নীতি করে কোম্পানি পরিচালনা করেন। অথচ তাকেই বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র সদস্য (নন-লাইফ) পদে নিয়োগ দেয় সরকার। আর এই দায়িত্ব পাওয়ার পর আইন পরিপালনের চেয়ে নিজের পছন্দকেই বেশি প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে।

আবু বকর সিদ্দিক মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি। কোম্পানিটি থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। আর এর দুই মাস পরেই ৩ ডিসেম্বর তাকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (নন-লাইফ) পদে নিয়োগ দেয় সরকার।

আইডিআরএ’র দায়িত্ব পালনে যেসব অভিযোগ:

হোমল্যান্ড লাইফের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডলের অপসারণ আদেশের বিরুদ্ধে করা উচ্চ আদালতের রিট মামলাটি কোনো শর্ত ছাড়াই প্রত্যাহারের আশ্বাস দেন আইডিআরএ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক। কিন্তু ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল মামলা তুলে নেয়ার পরই তার ওপর নতুন করে ৪টি শর্ত আরোপ করে অপসারণ আদেশ সংশোধন করা হয়।

আইডিআরএ’র কাছে দাখিল করা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডলের লিখিত অভিযোগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এর আগে আইডিআরএ থেকে অনুমোদিত এবং সকল নথিপত্র বৈধ থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি একটি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির সিইও পদের এক প্রার্থীর নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র তদন্তের মুখোমুখি করেন আবু বকর সিদ্দিক। তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে নথিপত্র তদন্তের নির্দেশ দেন বলে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া ওই কর্মকর্তা আরো অভিযোগ করেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে তদন্ত দেয়ায় তার নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে পড়ে। যা তার পেশাগত দায়িত্ব পালনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এবং মুখ্য নির্বাহী আবদুল খালেক মিয়াকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তার অপসারণের অনুমোদন প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেন আইডিআরএ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক। যা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা- ২০১২ এর ৭(৫) ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আইন লঙ্ঘনের এই ঘটনায় আইডিআরএ’র সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

২০২৫ সালের ২০ আগস্ট আবদুল খালেক মিয়ার চাকরি অবসান করে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, যা ২৪ আগস্ট নামঞ্জুর করে আইডিআরএ। কিন্তু আইডিআরএ’র সেই সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করেই পরদিন (২৫ আগস্ট) আবদুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে কোম্পানিটি।

তদন্ত কমিটি পরবর্তী ৩ সেপ্টেম্বর আবদুল খালেক মিয়াকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিলে, ১১ সেপ্টেম্বর তিনি লিখিত জবাবে কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আইডিআরএ’র নির্দেশ উপেক্ষা করে গঠিত এই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় থাকায় তিনি শুনানিতে অংশ নিতে অপারগতা জানান। তা সত্ত্বেও কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে তার অপসারণের পথ তৈরি করে দেয়া হয়।

অনিয়ম না করার হলফনামা দিয়েও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি:

মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড আর কোনো অনিয়ম করবে না বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে এমন হলফনামা দিয়েছিলেন আবু বকর সিদ্দিক। এই হলফনামা তিনি দেন ২০২১ সালের ৭ জুন।  

২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পযর্ন্ত সময়ে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ১৩০ ধরনের অনিয়ম করার প্রমাণ পায় আইডিআরএ’র তদন্তে। এতে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সকে জরিমানা করে আইডিআরএ। এই ঘটনায় ভবিষ্যতে কোম্পানিটি আর কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করবে না -এমন হলফনামা দেন আবু বকর সিদ্দিক।

তবে এমন অঙ্গীকারের কোনো তোয়াক্কা করেননি আবু বকর। হলফনামা দেয়ার দু’মাস পরে কোম্পানিটির চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখায় তদন্ত করে আবারো অনিয়ম করার প্রমাণ পায় আইডিআরএ।

এরপর আবারো বিশেষ নিরীক্ষা করে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ৭৯টি অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এমজে আবেদিন এন্ড কোং। কোম্পানিটির ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালে মে মাসের কর্মকাণ্ডের ওপর পরিচালিত এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর।

এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- বাস্তবে কর্মকান্ডে নেই এমন ব্যক্তিদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেখিয়ে কমিশন প্রদান, অগ্নিকান্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারনের স্টক রিপোর্ট ছাড়াই বীমা দাবি পরিশোধ, আইন অমান্য করে অতিরিক্ত ব্যয়, ভুয়া কর্মকর্তার নামে বেতন-ভাতা প্রদান, আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত কমিশন প্রদান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজনদের এজেন্ট কমিশন প্রদান অন্যতম।

৪৭ জন এজেন্টের মধ্যে ১৮ জনই আত্মীয়-স্বজন:

মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ৪৭ জন এজেন্টের মধ্যে ১৮ জনই কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, শ্যালিকা, ভাই এবং বোন। এই ১৮ জন এজেন্টকে নিয়োগ দেখানো হয়েছে প্রধান কার্যালয়ের করপোরেট ব্রাঞ্চসহ দেশের ১৫টি ব্রাঞ্চে।

এসব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে রয়েছে- প্রধান কার্যালয়ের করপোরেট শাখার ইনচার্জ বিএম ফারুকের স্ত্রী রুহিমুন নেছা রুমা, ডেপুটি ম্যানেজার ফিরোজ মিয়ার স্ত্রী তাছলিমা আক্তার, ডিজিএম মাহবুবের স্ত্রী রুবিনা ইয়াসমিন, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মাহবুব শাহিনের ভাই মারুফ হাসান বুলবুল, গাজীপুর ব্রাঞ্চের জিএম মশিউর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ আখতার, মিরপুর শাখার জুনিয়র অফিসার তুশারের ভাই সানোয়ার বিপ্লব, সাভারের হেড অব ব্রাঞ্চ শাহজাহান আলীর স্ত্রী শাহানারা বেগম;

কাওরানা বাজার শাখার কর্মকর্তা পারভীন আফসারীর ছেলে নিয়ামুল কবির আফসারী, দেয়ান হাট শাখার এসএভিপি মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে মো. শাহ নেওয়াজ, মার্কেটিং কর্মকর্তা জাহিদ হোসেনের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন, মগবাজার শাখার ম্যানেজার খুদিরামের শ্যালীকা নিপা রাণী দাস, খুলনা শাখার এডিপি নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজনিন আকতার, কোম্পানিটির আরেক কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী সোহাগের স্ত্রী হাফিজা আখতার;

নয়াবাজার শাখার ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী শালীনা আখতার তাঁরা, মানিকগঞ্জ শাখার ম্যানেজার সজ্ব জামানের ভাই মোস্তফা কামাল, এলিফ্যান্ট রোড শাখা ইনচার্জ জিল্লু রহমানের স্ত্রী শামীমা জাহান, বগুড়া বড়গলা শাখার হেড অব ব্রাঞ্চ শহিদুল আলমের ভাই ইউনূস উদ্দিন আহমেদ, কাকরাইল শাখার ইনচার্জ হায়দার আলীর ভাই মাহবুব হাসান।

আত্মীয়-স্বজনদের এজেন্ট দেখিয়ে ৩ কোটি টাকার বেশি কমিশন প্রদান:

আইডিআরএ’র কাছে দাখিল করা এজেন্ট তালিকা অনুসারে, ২০২২ সালে ১৫ জন আত্মীয়-স্বজনকে এজেন্ট দেখিয়ে ৩ কোটি ৩ লাখ ৩৭ হাজার ১২০ টাকার এজেন্ট কমিশন প্রদান করেছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।  

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমিশন দেয়া হয়েছে কোম্পানিটির কারওয়ান বাজার শাখার কর্মকর্তা পারভীন আফসারীর ছেলে নিয়ামুল কবির আফসারীর নামে। ৯২৫টি পলিসির বিপরীতে তাকে ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৭ টাকা কমিশন দেয়া হয়েছে।

একইভাবে ৩৭ লাখ ৫৪ হাজার ২ টাকা কমিশন দেয়া হয়েছে খুলনা শাখার এডিপি নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজনিন আকতারকে। ২০২২ সালে তার নামে সংগৃহীত পলিসি দেখানো হয়েছে ৬০৬টি।

অপরদিকে প্রধান কার্যালয়ের করপোরেট শাখার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মাহবুব শাহিনের ভাই মারুফ হাসান বুলবুলের নামে এজেন্ট কমিশনে দেয়া হয়েছে ২৯ লাখ ২২ হাজার ৭৮১ টাকা।

ভুয়া এজেন্টের নামে ৭৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা কমিশন প্রদান:

বাস্তবে কর্মকান্ডে নেই এমন ব্যক্তিদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেখিয়ে কমিশন প্রদান করেছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। বিশেষ নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে এমন তিন জন এজেন্টের তথ্য উঠে এসেছে। এরা হলেন- মতিঝিল শাখার এজেন্ট এজেডএম মাসুদ সালেহীন, সাভার শাখার এজেন্ট শাহানারা বেগম এবং দেয়ান হাট শাখার এসএভিপি মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে মো. শাহ নেওয়াজ।

২০১৯ থেকে ২০২১ সালে এই ৩ জনের নামে মোট ১ কোটি ৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন দেয়া হয়েছে; অথচ বাস্তবে তারা মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের এজেন্ট নন।

এর মধ্যে ২০১৯ সালে কমিশন দেয়া হয়েছে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, ২০২০ সালে ৩৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং ২০২১ সালে ২৪ লাখ ২ হাজার টাকা। এছাড়াও ২০২২ সালে মাসুদ সালেহীনকেই ৩০ লাখ ৩ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন প্রদান করেছে মেঘনা ইন্সুরেন্স।

অতিরিক্ত এজেন্ট কমিশন প্রদান ২ কোটি ৪৫ লাখ ২১ হাজার টাকা:

আইডিআরএ’র নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ২০১৯ ও ২০২০ সালে মোট ২ কোটি ৪৫ লাখ ২১ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন  বেশি দিয়েছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। নেট প্রিমিয়ামের ওপর ভিত্তি করে অনুমোদিত এজেন্ট কমিশনের চেয়ে এই টাকা বেশি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিশেষ নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে।

এর মধ্যে ২০১৯ সালে ফায়ার, মেরিন কার্গো, মটর ও বিবিধ বীমায় মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন বেশি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ২০২০ সালে মটর বীমায় ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন বেশি দিয়েছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।

বেতনভুক্ত কর্মকর্তাকে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার এজেন্ট কমিশন প্রদান:

বেতনভুক্ত কর্মকর্তাকেও দেয়া হয়েছে এজেন্ট কমিশন। এই কর্মকর্তার নাম রোজিনা শাহীন, পদবী জেনারেল ম্যানেজার। ২০১৯ ও ২০২১ এই দুই বছরে মোট ২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এজেন্ট কমিশন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে দেয়া হয়েছে ২২ লাখ টাকা ও ২০২১ সালে ৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।

অপরদিকে একই সময়ে বেতন-ভাতা দেয়া হয়েছে মোট ৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা ও ২০২১ সালে ২ লাখ ৬ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয়েছে।

রোজিনা শাহীন মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ডামি কর্মকর্তা অথবা ডামি এজেন্ট বলে মনে করছেন আইডিআরএ’র নিয়োগ করা বিশেষ নিরীক্ষক দল।

দেড় কোটি টাকার ভুয়া বীমা দাবি পরিশোধ:

আবু বকর সিদ্দিক মুখ্য নির্বাহীর দায়িত্বে থাকাকালে স্টক রিপোর্ট ছাড়া ও ক্লেইম ফাইল নেই এমন ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার টাকার ভুয়া বীমা দাবি পরিশোধ করেছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।

এর মধ্যে স্টক রিপোর্ট ছাড়া ২০১৯ সালে ১৪ লাখ ৭ হাজার টাকা, ২০২০ সালে ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ও ২০২১ সালে ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।

অপরদিকে ক্লেইম ফাইল নেই এমন দাবি পরিশোধ করা হয়েছে ২০১৯ সালে ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং ২০২০ সালে ৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কোম্পানিটির পরিশোধিত এসব বীমা দাবি সংক্রান্ত ফাইল পত্র নিরীক্ষক দলকে দেখাতে পারেনি মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।

মূলত: নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নথিপত্র তৈরি করে বীমা দাবি পরিশোধ দেখিয়ে তহবিল আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বেআইনীভাবে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে যোগদান করায় আবু বকর সিদ্দিকের নিয়োগ চুক্তি বাতিল

কর্ম অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেই ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক।

ফলে কর্ম অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ অনুমোদনের আবেদন অনুমোদন করেনি।

অপরদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী পদে যোগদান করায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদকে শোকজ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

এই ঘটনায় আবু বকর সিদ্দিকের সাথে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ চুক্তি বাতিল করে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ।

২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় আবু বকরকে ৩ বছরের জন্য মুখ্য নির্বাহী পদে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স। মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা জরিমানা:

ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিধি লঙ্ঘন করে ২০২৩ সালে অতিরিক্ত ব্যয় করায় মেঘনা ইন্স্যুরেন্সকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করে আইডিআরএ। জরিমানা আরোপের এই সিদ্ধান্ত হয় ২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারি।

ওই সময় মেঘনা ইন্স্যুরেন্সসহ ১৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির এ সংক্রান্ত জরিমানার তথ্য প্রকশ করে কর্তৃপক্ষের নন-লাইফ অনুবিভাগের বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় পরিবীক্ষণ শাখা।

সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগের শর্ত লঙ্ঘন:

সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগের শর্ত লঙ্ঘন করায় ২০২৪ সালে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে আইডিআরএ। ২০২৩ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিনিয়োগ সংক্রান্ত তদন্তে কোম্পানিটির এই অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

জুবিলি রোড শাখায় বাকি ব্যবসার পুনরাবৃত্তি:

২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের চট্টগ্রামস্থ জুবলী রোড শাখা পরিদর্শন করে কোম্পানিটির ১টি নৌ বীমা ও ৫টি অগ্নি বীমা পলিসি বাকীতে ইস্যু করার প্রমাণ পায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত দল।

এই ঘটনায় ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে ‘ভবিষ্যতে এ ধরণের ভুল যেন আর না করা হয় সে জন্য কোম্পানিকে কঠোরভাবে সতর্কতা অবলম্বনের বার্তা দিয়ে পত্র প্রেরণ করতে হবে’ বলে সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ।

বাকী ব্যবসা করায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা জরিমানা:

বাকীতে বীমা ব্যবসা করাসহ অনিয়ম, জালিয়াতি এবং তহবিল তছরূপের ঘটনায় ২০২১ সালে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।  

কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় ও ১০টি শাখা কার্যালয় পরিদর্শনে এসব অনিয়মের প্রমাণ পায় কর্তৃপক্ষ। জরিমানার এই তথ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি।

২০২১ সালের বিশেষ নিরীক্ষায় ২ লাখ টাকা জরিমানা:

২০২১ সালে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সসহ ১০টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিতে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। ওই নিরীক্ষায় কোম্পানিগুলোর নানান অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

পরবর্তীতে এসব অনিয়মের বিষয়ে কর্তৃপক্ষে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ৮টি কোম্পানিকে জরিমানা করা হয়, যার মধ্যে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সও রয়েছে।

বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে আসা বিভিন্ন অনিয়মের জন্য মেঘনা ইন্স্যুরেন্সকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে আইডিআরএ। এই জরিমানা আরোপ করা হয় ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর।

ফাঁকি দেয়া ভ্যাট পরিশোধ না করে যা করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিক:

২০১১-২০১৮ সালে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ১৩ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উঠে আসে আইডিআরএর ভিজিলেন্স টিমের তদন্তে। এ ঘটনায় ২০১৯ সালে কোম্পানিটিকে জরিমানার পাশাপাশি ফাঁকি দেয়া ভ্যাটের টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু ভ্যাট পরিশোধের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেননি আবু বকর সিদ্দিক।

ফাঁকি দেয়া ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে কিনা তা জানতে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবু বকর সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে তিনি বলেন, ভ্যাট ও স্ট্যাম্পের ১৩ কোটি টাকা এখনো সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি। এনবিআর বা আইডিআরএ থেকে আর কিছু না বলায় বিষয়টি একই অবস্থায় রয়েছে।

সোয়া কোটি টাকা জরিমানায় চাপা সাড়ে ২৬ কোটি টাকার প্রিমিয়াম গোপন:

২০১১-২০১৮ সালে ফাঁকি দেয়া ভ্যাটের টাকাই যে শুধু পরিশোধ করেনি তা নয়, বরং অপ্রদর্শিত প্রিমিয়ামের টাকাও পরবর্তীতে কোম্পানির হিসাবে দেখায়নি মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও কোম্পানিটির তছরূপকৃত প্রিমিয়ামের সাড়ে ২৬ কোটি টাকা উদ্ধারেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

ফলে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা জরিমানা দিয়েই ধামাচাপা পড়েছে ২৬ কোটি ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৭৩ টাকার গোপনকৃত প্রিমিয়াম।

অর্জিত প্রকৃত প্রিমিয়ামের পরিমাণ পরিবর্তন করে নামমাত্র প্রিমিয়ামের রেকর্ড করে তহবিল তছরূপের সাড়ে ২৬ কোটি টাকা সমন্বয় করা হয়েছে কিনা -এমন প্রশ্নের জবাবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ও বর্তমান আইডিআরএ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এ জন্য তো জরিমানা দিচ্ছি।

আইনের চেয়ে নিজের পছন্দকেই প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র সদস্য (নন-লাইফ) ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, আইডিআরএ’র কোন সদস্য এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে এখানে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়ারও সুযোগ নেই।

তবে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে দায়িত্বপালনকালে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি আইডিআরএ’র সদস্য (নন-লাইফ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক।