সঠিক তথ্যের ঘাটতি ও দ্বৈত সার্ভার বীমা খাতের বড় সংকট

আগামী সপ্তাহ থেকে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু: আইডিআরএ চেয়ারম্যান

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক সংকটে থাকা সাত থেকে আটটি বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের বকেয়া দাবি আগামী সপ্তাহ থেকে পরিশোধ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভীন।

তিনি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্পদ লিকুইডেট করা, জমি বিক্রি এবং বন্ড ও এফডিআর থেকে অর্থ উদ্ধারের মাধ্যমে পাওয়া টাকা আইডিআরএ'র তদারকিতে একটি ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেখান থেকেই গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হবে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আর্থিক প্রতিবেদন ও ডেটা বিশ্লেষণবিষয়ক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গ্রাহকের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে সমস্যায় থাকা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

একই অনুষ্ঠানে বীমা খাতে সঠিক তথ্যের ঘাটতি এবং দ্বৈত সার্ভার ব্যবহারের বিষয়েও কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভীন।

তিনি বলেন, কিছু কোম্পানি একাধিক সার্ভার ব্যবহার করে প্রকৃত তথ্য আড়াল করছে। এর ফলে প্রকৃত প্রিমিয়াম আয়সহ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আসছে না।

এসব গোপন ও দ্বৈত সার্ভার সরিয়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা একীভূত করতে কোম্পানিগুলোকে ছয় সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান আরও বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বীমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলোর ঝুঁকির ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী তদারকি করা হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

বীমা কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম শনাক্তে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথভাবে বিশেষ অডিট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।

মীর নাদিয়া নিভীন বলেন, ব্যাংক হিসাব ও অর্থের লেনদেন শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং সহযোগিতার একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বর্তমান অডিট ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় পর প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কোনো কোম্পানির অডিট রিপোর্ট পেতে দেড় বছর সময় লাগলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়।

এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দ্রুত ও হালনাগাদ আর্থিক তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইডিআরএর নির্দেশনা না মানা কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে মীর নাদিয়া নিভীন বলেন, নিয়ম না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। বীমা খাতে মানুষের আস্থা ফেরাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও নন-কমপ্লায়েন্সের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর অবস্থানে থাকবে বলেও তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে আইআরএফ প্রেসিডেন্ট গোলাম মাওলা সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাজীম উদ্দিন এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা প্রবীর চন্দ্র দাস।

মো. কাজীম উদ্দিন বলেন, সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ না হওয়া খাতটির প্রতি আস্থাহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা ও দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার প্রভাব পুরো বীমা শিল্পের ওপর পড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে প্রয়োজন হলে কোম্পানির সম্পদ বিক্রির উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, দাবি পরিশোধকে বীমা কোম্পানিগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

কাজীম উদ্দিন জানান, ২০২৫ সালে ন্যাশনাল লাইফ মোট এক হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে এক হাজার ১১০ কোটি টাকা ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি ও সারভাইভাল বেনিফিট।

তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত দিনেই গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হয়েছে। আবার প্রয়োজন হলে কর্মীদের মাধ্যমে গ্রাহকের বাড়িতে চেক পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

গণমাধ্যম ও বীমা খাতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে সহযোগী হিসেবে দেখার আহ্বান জানান ন্যাশনাল লাইফের এই কর্মকর্তা।

তার মতে, সাংবাদিকদের গঠনমূলক সমালোচনা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক হতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বীমা খাতের পরিবর্তন ও গ্রাহকসেবার তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেও গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে।

সব কোম্পানি নিয়মিত ও সময়মতো দাবি পরিশোধ করলে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।