নিজস্ব প্রতিবেদক: ফোন চুরি বা হারিয়ে গেলে বীমা থাকলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে। তবে বীমা করা থাকলেই ফোনের পুরো দাম ফেরত পাওয়া যায় না। ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ভর করে পলিসির শর্ত, ফোনের বয়স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ওপর।
বাংলাদেশে বছরে ঠিক কত মোবাইল ফোন চুরি বা হারায়, তার হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে নেই। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে হারানো মোবাইল নিয়ে ২৯ হাজার ৫৫৩টি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি এবং ১৮টি মামলা হয়েছিল। ওই মাসে হারানো ফোনের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭১১টি। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছিল ৬ হাজার ৫৬টি।
সাম্প্রতিক উদ্ধার তথ্যেও ফোন হারানো ও চুরির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ হারানো বা চুরি হিসেবে জানানো ২ হাজার ৭টি ফোন উদ্ধার করে মালিকদের ফিরিয়ে দেয়। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানা এক মাসে ২৫১টি হারানো, চুরি ও ছিনতাই হওয়া ফোন উদ্ধার করেছিল।
তবে ঢাকার মোট চুরি-ছিনতাইয়ের কত অংশ মোবাইল ফোনকেন্দ্রিক, সে বিষয়ে আলাদা হালনাগাদ সরকারি তথ্য নেই।
ফোন হারানো বা চুরির আর্থিক ক্ষতি কমাতে দেশে ডিভাইস বীমার কিছু সেবা রয়েছে। এর একটি গ্রামীণফোনের মাধ্যমে দেয়া ‘অলট্রুইস্ট সিকিউর’। এই সেবায় বীমা সুরক্ষা দেয় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স।
আরেকটি সেবাদাতা ইনস্টাশিওর। এটি বীমা কোম্পানি নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর বীমা প্ল্যাটফর্ম বা ইনশিওরটেক প্রতিষ্ঠান। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ইনশিওরটেক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ইনস্টাশিওরের নাম রয়েছে।
তবে দেশে বর্তমানে কতটি প্রতিষ্ঠান ফোন বীমা দিচ্ছে, বছরে কত নতুন গ্রাহক এই বীমা নিচ্ছেন এবং মোট স্মার্টফোনের কত শতাংশ বীমার আওতায় রয়েছে- এসবের আলাদা সরকারি তথ্য নেই।
ফোনের দাম অনুযায়ী বীমার প্রিমিয়ামও আলাদা হয়। অলট্রুইস্ট সিকিউরের প্রকাশিত হার অনুযায়ী, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার ফোনে শুধু চুরি ও হারানোর বীমার জন্য বছরে ৭৫৯ টাকা দিতে হয়। ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ফোনে এই খরচ ১ হাজার ৯০৪ টাকা ৪০ পয়সা। আর ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ফোনে বছরে ৩ হাজার ৭৯৫ টাকা লাগে। ফোন ভেঙে যাওয়া বা অন্য ধরনের ক্ষতিও বীমার আওতায় রাখতে চাইলে প্রিমিয়াম আরও বেশি হয়।
তবে ফোন চুরি বা হারালে সাধারণত কেনার সময়কার পুরো দাম ফেরত পাওয়া যায় না। ফোন যত পুরোনো হয়, বীমার হিসাবে তার মূল্য তত কম ধরা হয়। বীমার ভাষায় একে অবচয় বলা হয়। ফোনের বয়স অনুযায়ী কেনা দামের ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বীমার মূল্য ধরা হতে পারে। দাবি করার সময় ফোন কতদিন ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও ক্ষতিপূরণের অঙ্কে প্রভাব ফেলে।
ক্ষতিপূরণের একটি অংশ গ্রাহককেও বহন করতে হয়। অলট্রুইস্ট সিকিউরের ক্ষেত্রে এই অংশ সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। তবে দাবির ১০ শতাংশ ১ হাজার টাকার কম হলে সেই অঙ্কই দিতে হয়।
ফোন হারিয়ে গেলে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করতে হয়। চুরি হলে এফআইআর বা মামলা-সংক্রান্ত পুলিশের কাগজ লাগে। হারানো সিমের বদলে নতুন সিম নেয়ার প্রমাণও জমা দিতে হয়।
ফোন হারানো বা চুরির সাত দিনের মধ্যে বীমা প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হয়। এরপর ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়।
বাংলাদেশে কেনা ও বীমা করা ফোন বিদেশে চুরি বা হারালেও পলিসির শর্ত অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশের কী ধরনের প্রতিবেদন লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
ইনস্টাশিওরেও ফোন চুরি হলে ফোনের বয়স অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হিসাব করা হয়। সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ কেনার দামের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এখানেও গ্রাহককে একটি অংশ বহন করতে হয়। দাবির ১০ শতাংশ ৫০০ টাকার কম হলে সেই অঙ্ক, আর বেশি হলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দিতে হতে পারে।
তবে ফোন বীমায় বছরে কত দাবি আসে, কতটি অনুমোদন বা বাতিল হয়, কত টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় কিংবা কতজন গ্রাহকের দাবি আটকে আছে- এসবের আলাদা জাতীয় পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই। অলট্রুইস্ট সিকিউর ও ইনস্টাশিওরের প্রকাশ্য তথ্যেও দাবি নিষ্পত্তি বা গ্রাহকের অভিযোগের সামগ্রিক হিসাব পাওয়া যায় না।
আইডিআরএর প্রকাশিত নন-লাইফ বীমার তথ্যে ডিভাইস বীমার দাবি ও প্রিমিয়ামের আলাদা হিসাবও দেখা যায় না। ফলে দেশে ফোন বীমার পরিসর এবং দাবি নিষ্পত্তির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন।
বীমা কোম্পানি দাবি না দিলে বা দাবি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ করা যায়। সেখানে সমাধান না হলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা বা ১৬১৩০ হটলাইনে যোগাযোগ করা যায়।
ফোন বীমা তাই চুরি বা হারানোর পর পুরো দাম ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। পলিসি নেয়ার আগে কী ধরনের ক্ষতি বীমার আওতায় থাকবে, কত প্রিমিয়াম দিতে হবে, ফোন পুরোনো হলে ক্ষতিপূরণ কতটা কমবে এবং কোন কারণে দাবি বাতিল হতে পারে- এসব শর্ত বুঝে নেয়া জরুরি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।