বিদেশে ১৯৭ মিলিয়ন ডলার মুনাফা, কেন বিদেশমুখী দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালে বিদেশি ব্যবসা থেকে ১৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নিট মুনাফা করেছে। দেশটির ফাইন্যান্সিয়াল সুপারভাইজরি সার্ভিস (এফএসএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের ১৫৯.১ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ৩৭.৯ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৪ শতাংশ। এমন প্রবৃদ্ধি শুধু বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের ফল নয়, বরং এটি দেখাচ্ছে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত বীমা শিল্প নতুন খাতে প্রবেশ করে আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে পারে।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দক্ষিণ কোরিয়ার চারটি লাইফ বীমা এবং আটটি সাধারণ বীমা কোম্পানি বিশ্বের ১১টি দেশে মোট ৪৬টি বিদেশি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এর মধ্যে ৩৫টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ১১টি স্থানীয় শাখা। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৪৪। বিদেশি কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল এশিয়ায়, যেখানে মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ভিয়েতনামে সাতটি, ইন্দোনেশিয়ায় ছয়টি এবং চীনে চারটি কার্যক্রম রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি, যুক্তরাজ্যে তিনটি এবং সুইজারল্যান্ডে একটি কার্যক্রম রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলো বিদেশমুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশীয় খাতে প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা। বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর একটি দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি প্রায় স্থবির। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে, প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং বীমা শিল্প ইতোমধ্যে উচ্চ বিকাশের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন গ্রাহক অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় কোম্পানিগুলো দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতি ও তরুণ জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ দেশগুলোতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

বিদেশি মুনাফার সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে এশিয়া অঞ্চল থেকে। ২০২৫ সালে এশিয়ায় পরিচালিত কার্যক্রম থেকে নিট মুনাফা হয়েছে ১২১.৬ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বিদেশি মুনাফার প্রায় ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৬৬.৪ মিলিয়ন ডলার, যা মোট মুনাফার প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি ব্যবসা থেকে অর্জিত মোট মুনাফার প্রায় ৯৬ শতাংশই এসেছে এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো বিদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালে তাদের বিদেশি কার্যক্রম থেকে নিট মুনাফা ৬৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০৯.৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ৭০.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান। নতুন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ, ব্যাংকাস্যুরেন্স কার্যক্রম সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবীমা ও অবসরভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশ এই প্রবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, নতুন অধিগ্রহণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব বাদ দিলে কিছু পুরোনো বিদেশি কার্যক্রমে মুনাফা কমেছে। তবুও সামগ্রিকভাবে লাইফ বীমা খাত বিদেশে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ বা নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর মুনাফা ৯৫.১ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮৭.৭ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০২৫ সালের মার্চে মিয়ানমারের বড় ভূমিকম্প এবং নভেম্বরে থাইল্যান্ডের ভয়াবহ বন্যার কারণে ক্ষতিপূরণ দাবি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত দাবি পরিশোধ করতে হয়েছে, যা সরাসরি মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বৈশ্বিক বীমা শিল্পের অন্যতম বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

বিদেশি মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি বড় চালিকা শক্তি ছিল অধিগ্রহণ বা মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন (এমঅ্যান্ডএ) উদাহরণ হিসেবে, হানওয়া লাইফ ইন্দোনেশিয়ায় একটি ব্যাংক অধিগ্রহণ করেছে, যা ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভেলোসিটি ক্লিয়ারিং অধিগ্রহণের ফলে আয় ও ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। নতুন দেশে শূন্য থেকে ব্যবসা শুরু করার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়ার মাধ্যমে দ্রুত গ্রাহকভিত্তি, বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং আয় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলো এখন প্রবৃদ্ধির অন্যতম কৌশল হিসেবে অধিগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির শক্ত ভিত্তিও বীমা শিল্পের এই অগ্রগতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রপ্তানি ৭০৯.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে। শুধু সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ রপ্তানি থেকেই এসেছে ১৭৩.৪ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, রাসায়নিক শিল্প এবং প্রযুক্তি খাত দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। উন্নত শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি এবং উচ্চ আয় মানুষের আর্থিক পরিকল্পনায় বীমাকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দিয়েছে।

দেশটির সাধারণ মানুষের আয় প্রধানত শিল্প, প্রযুক্তি, সেবা এবং রপ্তানিমুখী খাত থেকে আসে। উচ্চ জীবনমান এবং আর্থিক সচেতনতার কারণে লাইফ বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, অবসরভাতা পরিকল্পনা এবং সম্পদ সুরক্ষা বীমা দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনার অংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বীমা-সচেতন দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। দেশটির বীমা প্রবেশ হার দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বীমা শিল্প শুধু আর্থিক সেবা নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার এই মডেল অনুসরণযোগ্য হতে পারে। দেশের বীমা কোম্পানিগুলো এখনো মূলত দেশীয় খাতনির্ভর। কিন্তু জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অভিবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বেশি এমন দেশগুলোতে বীমা সেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকাস্যুরেন্স, ডিজিটাল বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, কৃষি বীমা এবং অবসরভিত্তিক বীমা পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা খাতের এই চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও তুলে ধরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার এই সময়ে শক্তিশালী পুনর্বীমা ব্যবস্থা, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুভিত্তিক বীমা পণ্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দেখাচ্ছে, সীমিত দেশীয় খাতেও সঠিক কৌশল, প্রযুক্তি, অধিগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো নতুন আয়ের উৎস তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।