শ্রীলঙ্কায় ১০ বছরে ১০ গুণ প্রবৃদ্ধি, দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইফ বীমাকারী সফটলজিক লাইফ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত এক দশকে শ্রীলঙ্কার লাইফ বীমা খাতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা কোম্পানিগুলোর একটি সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ১০ বছরে প্রিমিয়াম আয় প্রায় ১০ গুণ বাড়িয়ে এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইফ বীমা কোম্পানি। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার লাইফ বীমা খাতে কোম্পানিটির অংশীদারিত্ব ১৭ শতাংশের বেশি।

১৯৯৯ সালে ‘এশিয়ান অ্যালায়েন্স ইন্স্যুরেন্স’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে সফটলজিক গ্রুপ এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এরপর নতুন পণ্য চালু, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্গে সমন্বয় এবং গ্রাহকসেবার উন্নয়নের মাধ্যমে কোম্পানিটি দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করে। ২০১৬ সালে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা ব্যবসা পৃথক করার পর এর নাম পরিবর্তন করে ‘সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ রাখা হয়।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির গ্রস রিটেন প্রিমিয়াম ৪০ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপির সীমা অতিক্রম করেছে। ২০২৩ সালে তাদের রাজস্ব ছিল প্রায় ৩১.৮ বিলিয়ন রুপি, নিট মুনাফা ২.৮৪ বিলিয়ন রুপি এবং মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫১.৩ বিলিয়ন রুপি। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী বিক্রয় প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক, ব্যাংকাস্যুরেন্স, মাইক্রোইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১১৫টির বেশি শাখা রয়েছে। প্রায় এক হাজার কর্মীর পাশাপাশি হাজারো বিক্রয় প্রতিনিধি দেশজুড়ে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছেন।

বর্তমানে সফটলজিক লাইফ ১৩ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন সুরক্ষা দিচ্ছে, যা শ্রীলঙ্কার লাইফ বীমা খাতের অন্যতম বৃহৎ গ্রাহকভিত্তি। কোম্পানিটির পোর্টফোলিওতে রয়েছে প্রায় ৬৭টি পণ্য ও রাইডার। জীবন সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবীমা, বিনিয়োগ, অবসর পরিকল্পনা, করপোরেট বীমা এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত সুবিধাসহ নানা ধরনের পণ্য তারা সরবরাহ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো মাইক্রোইন্স্যুরেন্স। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য স্বল্প প্রিমিয়ামের বীমা পণ্য চালুর মাধ্যমে তারা নতুন গ্রাহকদের বীমার আওতায় এনেছে। এর ফলে এমন অনেক মানুষ প্রথমবারের মতো বীমা সুরক্ষা পেয়েছেন, যারা আগে এই সুবিধার বাইরে ছিলেন।

শ্রীলঙ্কার বীমা শিল্পে এখনো প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। দেশটির বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মোট বীমা প্রবেশহার (ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন) জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশ। এর মধ্যে লাইফ বীমার অংশ প্রায় ০.৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত দেশটির মোট গ্রস রিটেন প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৩.৬ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করেছে। তারা শতভাগ স্বয়ংক্রিয় পলিসি ইস্যু ব্যবস্থা, অটো-আন্ডাররাইটিং এবং এআই-চালিত ক্লেইম মূল্যায়ন প্রযুক্তি চালু করেছে। এর ফলে পলিসি অনুমোদনের সময় কমেছে, পরিচালন ব্যয় হ্রাস পেয়েছে এবং গ্রাহকসেবা আরও দ্রুত ও সহজ হয়েছে। এই উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘এআই ইনিশিয়েটিভ অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করে।

সফটলজিক লাইফের আরেকটি আলোচিত উদ্যোগ হলো ‘হেলথ স্কোর’। এটি একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যেখানে গ্রাহকের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য অভ্যাস এবং শারীরিক সুস্থতার বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি স্বাস্থ্য সূচক তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়।

দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। সফটলজিক লাইফের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রায় ৯২ শতাংশ দাবি মাত্র এক দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। ডিজিটাল ডকুমেন্ট যাচাই, স্বয়ংক্রিয় প্রসেসিং এবং এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে এই দ্রুততা সম্ভব হয়েছে। দ্রুত দাবি পরিশোধকে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গ্রাহক আস্থা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মূলত সেবা খাত, পর্যটন, পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশটিতে গড় আয়ু প্রায় ৭৭ বছর, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম উচ্চ। ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অবসর পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাইফ বীমা পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কার বীমা খাতে প্রায় ২৯টি লাইসেন্সধারী বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সফটলজিক লাইফের প্রধান শক্তি হলো স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, বিস্তৃত মাইক্রোইন্স্যুরেন্স কার্যক্রম এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবন। এই সমন্বিত কৌশলই প্রতিষ্ঠানটিকে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইফ বীমা কোম্পানির অবস্থানে নিয়ে এসেছে।