উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে বীমা কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে নতুন ভূমিকা রাখছে বীমা কোম্পানিগুলো। তারা এখন সরাসরি প্রকল্পে অর্থায়ন না করে উন্নয়ন ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর দেয়া ঋণের ঝুঁকি ভাগ করে নিচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তারা আরও বেশি পরিমাণে ঋণ বিতরণ করতে পারছে, যা শেষ পর্যন্ত রাস্তা, কারখানা এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ঘাটতি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সরকারি বাজেট এবং উন্নয়ন সংস্থার সক্ষমতা সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই ঘাটতির কারণে অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পগুলো পিছিয়ে পড়ছে। ফলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় বেসরকারি পুঁজির গুরুত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে বীমা খাতের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন।
বিশ্বের বীমা শিল্প বর্তমানে দ্রুত সম্প্রসারিত একটি খাত, যার আকার ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৯.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই বিপুল মূলধনের একটি বড় অংশ এখনো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে না। উচ্চ ঝুঁকি, নীতিগত জটিলতা এবং সীমিত প্রকল্প প্রস্তুতির কারণে এসব দেশ এখনো তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠছে 'ঝুঁকি ভাগাভাগির মডেল'। এই মডেলে বীমা কোম্পানিগুলো সরাসরি প্রকল্পে বিনিয়োগ না করে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর দেয়া ঋণের ক্রেডিট ঝুঁকির একটি অংশ গ্রহণ করে। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যাংক যখন কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেয়, তখন সেই ঋণের সম্ভাব্য খেলাপি ঝুঁকির একটি অংশ বীমা কোম্পানি কভার করে।
এর ফলে কোনো প্রকল্পে ঋণ খেলাপি হলে ক্ষতির একটি অংশ বীমা কোম্পানি বহন করে। এতে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমে যায় এবং তারা একই মূলধন দিয়ে আরও বেশি প্রকল্পে ঋণ দিতে সক্ষম হয়। এই কাঠামোয় দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১ ডলার বীমা সক্ষমতা প্রায় ২ ডলার বা তার বেশি উন্নয়ন ঋণ তৈরিতে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মডেলটি উন্নয়ন অর্থায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। তাদের ভাষায়, এটি 'ঝুঁকি স্থানান্তর নয়, বরং ঝুঁকি ভাগাভাগির মাধ্যমে মূলধন সম্প্রসারণের একটি ব্যবস্থা'। এতে উন্নয়ন ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা একসঙ্গে কাজ করছে, যা একটি নতুন অর্থনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করছে।
এই মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)-এর ম্যানেজড কো-ল্যান্ডিং পোর্টফোলিও প্রোগ্রাম ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস (এমসিপিপি এফআইজি)। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো উন্নয়নশীল দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পোর্টফোলিওতে ক্রেডিট সুরক্ষা প্রদান করে, ফলে আইএফসি বড় পরিসরে উন্নয়ন ঋণ সম্প্রসারণ করতে পারে।
২০২৩ সালে এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ক্রেডিট বীমা সক্ষমতা সংগ্রহ করা হয়, যা আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ঋণ সম্প্রসারণে সহায়তা করছে।
এই ব্যবস্থার প্রভাব ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে দৃশ্যমান। ৭০টিরও বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই কাঠামোর মাধ্যমে অর্থায়ন পেয়েছে এবং ২৭টি দেশে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রবাহ বেড়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং কৃষি খাতে অর্থায়ন ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিচ্ছে।
তবে এই মডেল নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতাও জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং জলবায়ু ঝুঁকি ভবিষ্যতে এই কাঠামোর স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কম মুনাফা হলেও উচ্চ সামাজিক প্রভাবসম্পন্ন প্রকল্পে বীমা কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কতটা বজায় থাকবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজন বছরে প্রায় ১ থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল দেশের অনেক অঞ্চলে এখনো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৫০ শতাংশের নিচে সীমিত। ফলে এই ঝুঁকি ভাগাভাগির মডেলকে ভবিষ্যতে উন্নয়ন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঝুঁকি ভাগাভাগির এই মডেল এখন শুধু একটি আর্থিক উদ্ভাবন নয়, বরং বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের একটি নতুন দিক নির্দেশনা হিসেবে উঠে আসছে। আগামী ১০ বছরে এই মডেল আরও বিস্তৃত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো, শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সমন্বয় এবং টেকসই রিটার্ন নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।



