দাবি নিষ্পত্তি সহজ হচ্ছে, জনপ্রিয় হচ্ছে 'রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট'

রাজ কিরণ দাস: একটা সময় ছিল, যখন কোনো দুর্ঘটনা বা ক্ষতি হলে বীমা কোম্পানির লোকজনের জন্য গ্রাহককে অপেক্ষা করতে হতো। সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে আসবে, পরিদর্শন করবে, রিপোর্ট তৈরি করবে- এরপর শুরু হতো কাগজপত্র ও দীর্ঘ অপেক্ষা। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া শেষ হতে ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগত।
কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এখন জনপ্রিয় হচ্ছে ‘রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট’। সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি ডিজিটাল প্রক্রিয়া যেখানে গ্রাহক নিজেই মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি, ভিডিও বা লাইভ তথ্য পাঠায়। এরপর সেই তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন এবং অটোমেশন সিস্টেম ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে ক্লেইম নিষ্পত্তি অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা বা এমনকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বীমা খাতের কাজের ধরন পুরোপুরি পরিবর্তন করছে। আগে যেখানে সার্ভেয়ারকে ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করতে হতো, এখন পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হচ্ছে। বৈশ্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল ক্লেইম সিস্টেম চালু হলে ক্লেইম প্রসেসিং সময় গড়ে ৭০% থেকে ৯০% পর্যন্ত কমে যায়।
একজন গ্রাহকের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আগে যেখানে দুর্ঘটনার পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো, এখন একই ক্লেইম অনেক ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার এআই-ভিত্তিক স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লেইম অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন ইনসুরটেক এবং বীমা শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতসহ একাধিক উন্নত ও উদীয়মান বাজারে রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব বাজার মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কয়েক মিলিয়নেরও বেশি বীমা দাবি এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে বিভিন্ন শিল্প প্রতিবেদনে ধারণা দেয়া হয় এবং এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেন দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে
রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ তিনটি- সময় কমে যাওয়া, খরচ কমে যাওয়া এবং প্রক্রিয়া সহজ হওয়া। আগে যেখানে একটি সাধারণ ক্লেইম নিষ্পত্তিতে ৭ থেকে ১৪ দিন লাগত, এখন উন্নত সিস্টেমে তা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। এতে গ্রাহক দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন এবং বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর অপারেশনাল চাপও কমছে।
গ্রাহক অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন
এই প্রযুক্তির ফলে গ্রাহক অভিজ্ঞতায়ও বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রাহক মোবাইল অ্যাপ থেকেই নিজের ক্লেইম ট্র্যাক করতে পারেন। কোথায় কী অবস্থায় আছে তা রিয়েল টাইমে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনেই পেমেন্ট সম্পন্ন হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থায় গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায় এবং অভিযোগের হার কমে আসে।
প্রযুক্তির ব্যবহার
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে কয়েকটি প্রযুক্তি কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি বিশ্লেষণ করা হয় এবং ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব তৈরি করা হয়। কম্পিউটার ভিশন সেই ছবি থেকে বিস্তারিত তথ্য শনাক্ত করে।
বড় এলাকা বা দুর্গম স্থানের ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যাতে সরাসরি সেখানে না গিয়েও ক্ষতির অবস্থা নির্ধারণ করা যায়। একইভাবে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে পুরো এলাকার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া যায়।
এই সব প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে ক্লেইম মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুত, সহজ এবং আরও নির্ভুল করে তুলছে।
খরচও কমছে
বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ফিল্ড ভিজিট, গাড়ি ব্যবহার এবং লজিস্টিক খরচ অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্লেইম হ্যান্ডলিং খরচ ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে কোম্পানিগুলো একই খরচে বেশি গ্রাহককে সেবা দিতে পারছে।
ফ্রড ঝুঁকি নিয়ে বাস্তব চিত্র
শুরুর দিকে ধারণা ছিল, দূর থেকে ক্লেইম করলে জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এখন জিও-ট্যাগিং, টাইম-স্ট্যাম্প, মেটাডেটা ভেরিফিকেশন এবং এআই-ভিত্তিক ফ্রড ডিটেকশন ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ছবি বা ভিডিও কোথা থেকে এবং কখন তোলা হয়েছে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ফ্রড শনাক্ত করা আগের তুলনায় আরও কার্যকর হয়েছে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব
রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিদর্শকদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় গাড়ির ব্যবহার এবং জ্বালানি খরচ কমছে।
ইএসজি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি ক্লেইম ডিজিটালি সম্পন্ন হলে গড়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি CO₂ নির্গমন কমানো সম্ভব।
বাজার ও ভবিষ্যৎ
বিশ্বের বীমা বাজারে ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে এশিয়া, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট বীমা শিল্পের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বীমা খাতে ডিজিটাল সেবা বাড়ছে। কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যে মোবাইল-ভিত্তিক ক্লেইম সিস্টেম চালু করেছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ধাপে ধাপে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য নীতিমালা উন্নয়ন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট এখন আর নতুন কোনো ধারণা নয়, এটি এখন বাস্তবতা। দ্রুত সেবা, কম খরচ, স্বচ্ছতা এবং সহজ ব্যবহার- সব মিলিয়ে এটি বীমা খাতকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো একটাই, গ্রাহক এখন আর অপেক্ষা করছে না, বীমা সেবা এখন গ্রাহকের কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে।



